আমানতকারীদের টাকা নিয়ে লাপাত্তা আরডিপি ফাইন্যান্স

নিজস্ব সংবাদদাতা ঃ আমানতকারীদের গচ্ছিত বিপুল পরিমাণ টাকা নিয়ে ‘উধাও হয়েছেন’ সমবায় মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত আর্থিক প্রতিষ্ঠান আরডিপি ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট এমসিএস লিমিটেডের কর্মকর্তারা।
গচ্ছিত প্রায় ২০ কোটি টাকার বেশি ফেরত না পেয়ে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে দুটি মামলা করেছেন পটুয়ালীখালী সদর থানার কয়েকশ আমানতকারী। তবে প্রতিষ্ঠানটির কাছে মানুষের মোট কত আমানত রয়েছে সে ব্যাপারে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এক মাসেরও বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয়সহ ৭১টি শাখায় তালা ঝুলছে। এই পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটির সব ব্যাংক হিসাব স্থগিত করেছে বাংলাদেশ ফাইনানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।পটুয়াখালী সদর থানার ওসি জিয়াউদ্দিন জিয়া বলেন, আরডিপি ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট এমসিএস লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানটি এলাকার কয়েকশ’ লোকের ২০ কোটির বেশি টাকার আমানত নিয়ে লাপাত্তা হয়েছে। আমরা তাদেরকে খুঁজছি। আরডিপির বিরুদ্ধে দুটো মামলা হয়েছে। একটি স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট ও অন্যটি পেনাল কোডে। আমরা তা বাংলাদেশ ব্যাংককে জানিয়েছি।
পটুয়াখালীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এইচএম আজিমুল হক বলেন, আরডিপি সমবায়ী প্রতিষ্ঠান হলেও মাইক্রো ফাইন্যান্স (ক্ষুদ্র ঋণ) কার্যক্রম করছিল, আইন অনুযায়ী তারা তা পারে না।মামলার তথ্য জানার পর গত ১৮ জুন দেশের সব তফসিলি ব্যাংকে চিঠি পাঠিয়ে আরডিপির হিসাবে লেনদেন ৩০ দিনের জন্য স্থগিতের নির্দেশ দেয় বিএফআইইউ। একই সঙ্গে ওই প্রতিষ্ঠানের নামে বা স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে কোনো ব্যাংক হিসাব থাকলে তার তথ্যও জানাতে বলা হয়।
মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২ এর ২৩(১)(গ)ধারা অনুযায়ী এ নির্দেশনা দেওয়া হয় বলে বিএফআইইউর উপ-প্রধান বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ম. মাহফুজুর রহমান জানান।তিনি বলেন, পুলিশের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে আরডিপি ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড জনসাধারণের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে তা পরিশোধ করছে না। তাদের পাওয়াও যাচ্ছে না। এজন্য তাৎক্ষণিকভাবে তাদের ব্যাংক হিসাবের লেনদেন স্থগিত করা হয়েছে। আরডিপি ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া ছবি আরডিপি ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া ছবি প্রতিষ্ঠানটির ওয়েব সাইটে (যঃঃঢ়://ৎফঢ়ভরহধহপব.পড়স/নহ/যড়সব.যঃসষ) দেখা যায়, ২০০৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জে প্রথম শাখা চালুর মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করে আরডিপি গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান আরডিপি ফাইন্যান্স। এর পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক। এ ছাড়া আরও ৫ জন পরিচালক রয়েছেন।প্রতিষ্ঠানটির শরীয়াহ কাউন্সিলের প্রধান বা চেয়ারম্যান হিসেবে ওয়েবসাইটে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুহাম্মদ সালাহ উদ্দিনের নাম ও ছবি রয়েছে। রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ কয়েকজন মন্ত্রী ও বিশিষ্টজনের শুভেচ্ছাবাণীও রয়েছে ওয়েবসাইটে। এদের মধ্যে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙা এবং তথ্য ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক।
বুধবার ৩২ পুরানা পল্টন সুলতান আহমেদ প্লাজার নবম তলায় প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে প্রধান ফটক তালাবন্ধ দেখা যায়।
ওই ভবনের দশম তলায় ডিজি কমিউনিকেশনস নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা কাজি মোস্তাফিজুর রহমান জানান, গত এক মাস ধরে আরডিপির অফিস বন্ধ দেখছেন তিনি। আগে অফিস খোলা ছিল, কর্মকর্তারা আসতেন। কিন্তু গত দুই তিন মাস কিছু ঝামেলা হচ্ছিল বোধ হয়। অনেক লোক আসত। চিৎকার-চেঁচামেচি হত। আমরা শুনেছি লোকজনের টাকা-পয়সা নিয়ে তারা দিচ্ছে না। পরে তো দেখলাম অফিসটা বন্ধ হয়ে গেল।আরডিপি ফাইন্যান্সের ওয়েব সাইটের তথ্য অনুযায়ী, আটটি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি জনগণের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করে। যেকোনো পরিমাণ আমানতে ৫ বছরে দ্বিগুণ, ৭ বছরে তিনগুণ ফেরত দেওয়ার কথা তাদের। প্রতিষ্ঠানটি ২০ হাজার থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণও দেয়।২০০৭ সালে যুব কর্মসংস্থান সোসাইটি বা ‘যুবক’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান সারাদেশ থেকে মানুষের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে পরে ফেরত দেয়নি।পরে সরকার যুবকের কার্যক্রম বন্ধ করে সব সম্পত্তি অধিগ্রহণ করলেও আমানতকারীরা এখনও পুরো অর্থ বুঝে পাননি।