প্রশাসনের খামখেয়ালীপনায় ৫শ’কোটি লভ্যাংশ থেকে বঞ্ছিত চাষী-ব্যবসায়ীরা!

নিজস্ব সংবাদ দাতা ঃ রাজশাহীর সর্বত্রই এখন আম আর আম। হাটে, মাঠে, পাড়ার অলিগলি, পথে-প্রান্তরে শুধুই আম। তবে এরইমধ্যে বাজার থেকে গোপালভোগ ও মোহনভোগ বিদায় নিতে শুরু করলেও তাদের স্থলে এখনো রয়েছে ক্ষীরসাপাত, ল্যাংড়া, লখনা, রাণীপছন্দ, আ¤্রপালিসহ বাহারি নাম ও স্বাদের আম। এসব আমের বিরামহীন বেচাকেনা চলছে প্রাচীন এ জনপদে। আর গাছ থেকে আম নামানো ও বাজারজাতকরণ কাজের ব্যস্ততায় ফুরসত নেই এ পেশার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের। তবে চলতি বছরের ৫ জুন পর্যন্ত রাজশাহীতে গাছ থেকে আম পাড়া ও বাজারে বিক্রি নিষিদ্ধ করায় প্রায় ৪৫ থেকে ৬৫ শতাংশ ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন আমচাষিরা। আর যদি তাই হয়, তা হলে চলতি মৌসুমে প্রায় ৫শ’ কোটি টাকার বাণিজ্য থেকে বঞ্ছিত হয়েছেন রাজশাহীবাসী। তারপরেও উৎপাদন বিবেচনায় ব্যবসায়ীদের ধারণা প্রতিকুলতা থাকা স্বত্বেও আবহাওয়া ঠান্ডা হলে এবার রাজশাহীতে অন্তত সাড়ে ৩শ’ কোটি টাকার বাণিজ্য হবে। কিন্তু এ বাণিজ্যে ব্যবসায়ীরা লাভবান হলেও আমচাষীরা পথে বসে গেছে বললেই চলে। শুধু প্রশাসনের খামখেয়ালীপনায় এ ক্ষতির মুখে পড়েছে আমচাষীরা। প্রশাসন যদি ওই নির্দেশনা না দিতো তা হলে প্রায় ৭শ’ থেকে ৮শ’ কোটি টাকার বাণিজ্য হতো বলেও জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরাতারপরেও বর্তমানে আমকেন্দ্রীক ব্যবসা-বাণিজ্য পাল্টে দিয়েছে এ অঞ্চলের গ্রামীণ জনপদের অর্থনীতি। এ অঞ্চলের দু’টি বড় আমের মোকাম রাজশাহীর বানেশ্বর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি টাকার আম বেচাকেনা হচ্ছে। আর সেই সাথে আমের কারবার নিয়ে এ অঞ্চলের প্রায় ৫০-৬০ হাজার মানুষের মৌসুমি কর্মসংস্থানও হয়েছে। মধুমাস জ্যৈষ্ঠের পরও জুলাইয়ের মাঝামাঝি পযর্ন্ত চলবে ‘আম বাণিজ্য’। তাই গাছের আম নামানোর পারদর্শী থেকে আম চালানের ঝুঁড়ি বানানো এবং বাজারগুলোতে নানা সহায়ক কাজে নিয়োজিত লোকজনের কর্মসংস্থানে গ্রামীণ জনপদ ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। আম বাণিজ্যের কারণে অর্থবছরের শেষ দিকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতেও বেড়েছে লেনদেনের হার। রাজশাহীর সবচেয়ে বড় আমের বাজার পুঠিয়ার বানেশ্বরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের দর কষাকষিতে এখন মুখরিত থাকছে। এছাড়াও মহানগরীর সাহেব বাজার, শালবাগান, শিরোইল বাস টার্মিনাল, বিন্দুর মোড়, লক্ষীপুর, কোর্ট বাজারসহ রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বিড়ালদহ মাজার বাজার, বাঘা, চারঘাটসহ প্রতিটি উপজেলার বাজারে জমে উঠেছে আম ব্যবসা।
পুঠিয়ার উপজেলার তারাপুর গ্রামের আমচাষী আবদুল মান্নান সরকার, ছেলে তরিকুল, কান্দ্রা গ্রামের ইউসুফ মোল্লাসহ অনেকেই জানান, এবারের গরমে তাপমাত্রা বেশি থাকায় সব ধরনের আম আগেই পেকে গেছে। কিন্তু বাজারে বিক্রি নিষিদ্ধ থাকার কারণে তুলতে না পারায় অর্ধেক আমই নষ্ট হয়ে গেছে। আর ৫ জুনের পর এক সাথে সব ধরনের আম আসাতে বাজার মূল্য কমে গেছে। যে কারণে খিরসাপাত আম মাত্র ৮শ’ এবং ল্যাংড়া সাড়ে ৭শ’ টাকা মণ দরে বিক্রি করেছেন। যা গত বছরের তুলনায় চার ভাগের এক ভাগ দাম পেয়েছেন বলেও জানান তারা। বানেশ্বর হাটের পাইকারি ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান জানান, বর্তমানে আমের রাজা বলে পরিচিত গোপালভোগ, খিরসাপাত শেষ। আর ল্যাংড়াও শেষের পথে। তারপরেও কিছু কিছু জায়গায় পাওয়া যাচ্ছে তবে বাজার পূর্বের চেয়ে দুইগুন বেশী। সোমবার রাজশাহীর বাজারে খিরসাপাত ল্যাংড়া বিক্রি হয়েছে ১৮শ’ থেকে সাড়ে ১৯শ’ টাকা মণ। এবার সকল ধরনের আমই ৪৬ কেজিতে এক মণ ধরা হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনা মসজিদ এলাকার আমচাষি মকিম বলেন, আমের জাতের ধরন অনুযায়ী মে মাসের মাঝামাঝি থেকে আম পাকা শুরু হয়। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা থাকায় ওই সময় থেকে আমরা আম বাজারে বিক্রি করতে পারিনি। এ কারণে চলতি বছর পানির দরের চেয়েও কম দামে আম বিক্রি করতে হচ্ছে। যা লাভের তুলনায় প্রায় ৪৫-৬৫ শতাংশ কম। কানসাট ইউনিয়নের বাঁশবাড়ী মোড় এলকার আমচাষি শফিক বলেন, গরমের কারণে অনেক আম পেকে গাছ থেকেই পরে নষ্ট হয়েছে। আর মূল্য কম তো আছেই। সরকারের এ ধরনের সিদ্ধান্তে আমচাষীদের অপুরনীয় ক্ষতি হয়েছে বলেও জানান তিনি। লস গুনতে হচ্ছে আমাদের। তবে গত বছর কেমিক্যাল জাতীয় দ্রব্য ব্যবহারের প্রভাবে যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছিলো এবার তা অনেকটাই কেটে গেছে বলেও জানিয়েছেন চাষী-ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা।
সার্বিক বিষয়ে আম উৎপাদনখ্যাত এলাকা চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সাইফুল ইসলাম এফএনএস কে জানান, গুটি আম পাড়া বা বাজারে বিক্রির উপর কোনো নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়নি। তবে ল্যাংড়া, আশ্বিনা আমের ক্ষেত্রে প্রশাসনের তরফ থেকেই এ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল।
রাজশাহীর কৃষি অধিদপ্তদরের উপ-পরিচালক হযরত আলী বলেন, এ অঞ্চলে প্রায় আড়ইশ’ জাতের আম উৎপন্ন হয়। এবার রাজশাহীতে ১৬ হাজার ৫১৯ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে গত বছরের উৎপাদনই অর্থাৎ দুই লাখ ৫৭ হাজার ৫৩১ মেট্রিক টন। তবে এবার বৈরি আবহাওয়া ও টানা তাপদাহে আমের ফলন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে আমের আশানুরূপ ফলন পাওয়া যাচ্ছে না। আর আম চাষিদের ক্ষতি হওয়ার বিষয়ে বলেন, গত বছর ক্ষতিকারক কেমিক্যালের সাহায্যে কাঁচা আম পাঁকিয়ে বাজারজাত করা হয়েছে। তবে এবার প্রশানের তরফ থেকে নিষেধাজ্ঞা থাকায় তা কেউ করতে পারেনি। তবে সে ক্ষেত্রে আম চাষী বা ব্যবসায়ীদের ক্ষতির পরিমাণ ১০ শতাংশের বেশি নয় বলেও দাবি করেন তিনি।রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবদুল আলিম জানান, বর্তমান তাপদাহের কারণে ইতিমধ্যেই ফজলি আম পাকা শুরু হয়ে গেছে। আর এরকম চলতে থাকলে আগামি কয়েকদিনের মধ্যেই বাজারে সর্বশেষ আশ্বিনা আম উঠতে শুরু করবে। আর তা হলে রমযান মাসেই শেষ হয়ে যাবে আম। তবে রমজানের পর যেগুলো আম বাজারে থাকবে সেগুলো বেশি দাম পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সেক্ষেত্রে এ আবহাওয়া চলতে থাকলে গাছে আম রাখা বেশ কষ্ট হবে বলেও জানান তিনি। এ বিষয়ে হেরিটেজ রাজশাহীর সভাপতি গবেষক ও লেখক মাহাবুব সিদ্দিকি বলেন, চাষী ও ব্যবসায়ীদের সাথে প্রশাসনের বসে আম উত্তোলনের সময় বেধে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে এ ধরনের মতভেদ বা ক্ষতির প্রশ্ন উঠত না। তবে ভোক্তাদের উদ্যেশ্যে তিনি বলেন, বাজারে যতোই পাওয়া যাক না কেন ২৫ মে’র পূর্বে গোপল ভোগ, রাণীপছন্দ ১জুন, খিরসাপাত ৭জুন, লক্ষন ভোগ ১০, লেংড়া ১৫জুন, আ¤্রপালী ও ফজলি ১জুলাই, মল্লিকা ৭জুলাই এবং আস্বিনা আম ২০জুলাই’র আগে ক্রয় করা ঠিক হবে না। যদি এ সময়ের পর ভোক্তারা আম ক্রয় করে তা হলে ১০০ভাগ সঠিক ও নিরাপদ আম ভোগ করতে পারবে। তবে খুবই তাপদাহ হলে আস্বিনা আম ১৫জুলাই থেকেও ক্রয় করা যেতে পারে। এ ছাড়া আম সম্পর্কে এপার ও ওপার বাংলায় প্রথম ‘আম’ শিরোনামে তার লিখা একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। যা ইতিমধ্যেই দুই বাংলায় ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছেন বলেও জানান তিনি।