এবি ব্যাংকে শতাধিক ছাঁটাই

 

এবি ব্যাংকের দুরবস্থা সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত কর্মীদের ওপর পড়ল ছাঁটাইয়ের কোপ। নানা অনিয়ম, অব্যবস্থায় জর্জরিত এবি ব্যাংক করোনারভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের প্রথম ধাক্কায় বেতন কমিয়ে দেয়। গতকাল ২০২০-২১ অর্থবছরের ১২তম দিন পর্যন্ত শতাধিক কর্মী ছাঁটাই করে ব্যাংকটি। তবে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বক্তব্য, কর্মী ছাঁটাইয়ের কারণ করোনা নয়, কর্মীর অযোগ্যতা।

রোববার সকাল থেকেই ব্যাংকপাড়ার আলোচিত বিষয় ছিল এবি ব্যাংকের কর্মী ছাঁটাই। করোনাকালীন ব্যাংকপাড়ায় আলোচিত বিষয় কর্মীদের জন্য প্রণোদনা ঘোষণা করে তা প্রত্যাহার, বেতন কমানো ও কর্মী ছাঁটাই। ফলে প্রতিটি ব্যাংকের কর্মীদের মধ্যে ছাঁটাই আতঙ্ক কাজ করছে। এবি ব্যাংক কর্মী ছাঁটাই নিয়ে রোববার সকালে কার্যক্রম শুরু হলে পুরো ব্যাংকপাড়ায় ছড়িয়ে পড়ে। ছাঁটাইয়ের খবরে এবি ব্যাংকের কর্মীদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। করোনাকালে এভাবে কর্মী ছাঁটাই কেউই মেনে নিতে পারছেন না।

এবি ব্যাংকের ছাঁটাই হওয়া একজন কর্মী জানান, গত ৮ জুলাই থেকেই ১২১ কর্মীর উদ্দেশে চাকরিচ্যুতির নির্দেশনা জারি করে ব্যাংকটি। আর করোনা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্মীদের সুবিধা প্রত্যাহারের কাজ শুরু হয়। এতদিন কেউ মুখ খোলেননি। ছাঁটাইকৃত কর্মীদের সংখ্যা যোগ করলে ২০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে।

ব্যাংকের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, ছাঁটাই সম্পর্কিত এক নির্দেশনায় বলা হয়, ১২ জুলাই থেকে কিছু কর্মী ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের উদ্দেশে বলা হয়, আপনাদের সব বকেয়া এবং পাওনা পরিশোধ করা হবে। এবি ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী সকলকে তিন মাসের বেতন প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ভবিষ্যতে ব্যাংক টিকিয়ে রাখার জন্যই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় ব্যাংক আর অতিরিক্ত খরচ পরিচালনা করতে পারছে না। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নিলে তার জন্য তিনি নিজেই দায়ী থাকবেন। জানা যায়, আপাতদৃষ্টিতে করোনা অতিমারির কারণে কর্মী ছাঁটাই করা হচ্ছে বলে মনে হলেও ব্যাংকটি দীর্ঘদিন ধরে সমস্যায় পতিত।

সুযোগ বুঝে কর্মী ছাঁটাই করে খরচ কমিয়ে নিচ্ছে। এক সময়ের প্রথম সারির এ ব্যাংকটি উদ্যোক্তা পরিচালকদের লুটপাট অনিয়মে এখন নাজুক। বিশাল অঙ্কের এ খেলাপি ঋণের প্রধান দায় ব্যাংকটির দুর্নীতিবাজ কয়েকজন উদ্যোক্তার। তারা ব্যাংকটিকে একদিকে নিজেরা বেনামিতে লুটপাট করেছেন, অন্যদিকে যোগসাজশ করে অসাধু কিছু ব্যবসায়ীকে লুটপাটের সুযোগ দিয়েছেন। তারা শুধু ব্যাংক থেকে ঋণের নামে নেওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎই করেননি, ওই অর্থের প্রায় পুরোটাই বিদেশে পাচার করেছে বলে মনে করা হয়। করোনার দোহাই দিয়ে ১২১ কর্মীকে ছাঁটাই করা হচ্ছে বলা হলেও এ সংখ্যা আরও ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারি ব্যাংক হিসেবে ১৯৮২ সালে যাত্রা শুরু করে আরব বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিষ্ঠার ২৫ বছর পূর্তির পর ব্যাংকটির নাম বদলে হয়েছে এবি ব্যাংক। দেশে ও দেশের বাইরে সব মিলিয়ে ১০৫টি শাখা রয়েছে ব্যাংকটির। রয়েছে ৩০০টির বেশি এটিএম বুথ ও পাঁচটি সহযোগী কোম্পানি। এর মধ্যে অফশোর ব্যাংকিং সেবার জন্য রয়েছে আলাদা ইউনিট। ব্যাংকের সব ধরনের সেবা পণ্য রয়েছে এবি ব্যাংকের। বয়স, শ্রেণি ও পেশা বিবেচনায় রয়েছে আলাদা আলাদা ব্যাংকিং পণ্য। সরাসরি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও পিছিয়ে নেই ব্যাংকটি। বর্তমানে এবি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ২ হাজার ২০০।

 

গত ২৩ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা এক প্রতিবেদন অনুসারে, দেশের ব্যাংক পরিচালকদের মধ্যে এবি ব্যাংকের পরিচালকরা নিজ ব্যাংক থেকে সর্বোচ্চ ঋণ নিয়েছেন। তাদের ঋণের স্থিতি ৯০৭ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। এবি ব্যাংকের অফশোর ইউনিটের মাধ্যমে অর্থ পাচার করা কয়েকজন গ্রাহকও এখন শীর্ষ খেলাপির তালিকায় উঠে এসেছে। তার মধ্যে রয়েছেন ব্যবসায়ী এমএনএইচ বুলু। তার খেলাপি ঋণ ২৫০ কোটি টাকা। ফলে করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের আগে থেকেই ব্যাংকটি চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। করোনা মহামারি শুরু হলে ব্যাংকটি আরও বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়। করোনা অতিমারির নামেই ছাঁটাই কার্যক্রম শেষ করে বাণিজ্যিক ব্যাংক।

করোনা প্রাদুর্ভাবে লোকশানে পড়ার কারণে ছাঁটাই করা হচ্ছে বলে এবি ব্যাংকের কর্মীদের পক্ষ থেকে বলা হলেও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তারিক আফজাল বলছেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, ছাঁটাইয়ের কারণ করোনা নয়, যেসব কর্মীর পারফরমেন্স ভালো না এবং ভালো হওয়ার সম্ভাবনাও নেই তাদের ছাঁটাই করা হচ্ছে। ছাঁটাই প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে বছরের জানুয়ারি মাস থেকে। কর্মী ছাঁটাই নিয়ে তার পাল্টা প্রশ্নÑ এবি ব্যাংক দুই হাজার কর্মীকে বেতন দিতে পারলে এক-দেড়শ কর্মীকে বেতন দিতে পারবে না? তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকের সংখা ৮০-এর মতো হবে।

সর্বশেষ সংবাদ