কোরবানীর মুল কথা হলো আল্লাহর আনুগত্য ও সন্তুষ্টি অর্জন

হাফিজুল ইসলাম লস্কর. কোরবানী শব্দের শাব্দিক অর্থ আত্মত্যাগ, উৎসর্গ বা বিসর্জন ইত্যাদি। শরিয়তের পরিভাষায় আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহর নামে কোনো কিছু উৎসর্গ করার নাম কোরবানী। প্রচলিত অর্থে কোরবানী হলো পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে জিলহজ মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখের মধ্যে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সন্তুষ্টি লাভের জন্য নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তির নির্দিষ্ট জানোয়ার জবেহ করা।
কোরবানী একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি আদায় করা ওয়াজিব। প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থমস্তিষ্ক সম্পন্ন প্রত্যেক মুসলিম নর-নারী, যে ১০ যিলহজ্ব ফজর থেকে ১২ যিলহজ্ব সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে তার উপর কোরবানী করা ওয়াজিব।
কুরআন-হাদিসে কোরবানীর গুরুত্ব ও তাৎপর্য সম্পর্কে অনেক আলোচনা করা হয়েছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কুরআনে পাকের সবচেয়ে ছোট সূরা আল-কাওছারে বলেছেন, ‘অতএব তুমি তোমার প্রভুর উদ্দেশে নামাজ পড়ো এবং কোরবানী করো।’
সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কোরবানী পালন করে না তার ব্যাপারে হাদীস শরীফে এসেছে, ‘যার কুরবানীর সামর্থ্য রয়েছে কিন্তু কুরবানী করে না সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’ মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস : ৩৫১৯; আত্তারগীব ওয়াত্তারহীব ২/১৫৫।
ইবাদতের মূলকথা হল আল্লাহ তাআলার আনুগত্য এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন। তাই যেকোনো ইবাদতের পূর্ণতার জন্য দুটি বিষয় জরুরী। ইখলাস তথা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পালন করা এবং শরীয়তের নির্দেশনা মোতাবেক মাসায়েল অনুযায়ী তা সম্পাদন করা।
মহান আল্লাহ তায়ালার প্রত্যেক বিধানের পিছনে রয়েছে অর্ন্তনিহীত তাৎপর্য। বান্দা ও তার প্রভুর মাঝে গভীর ভালবাসা, অকৃত্রিম প্রেম-প্রীতি ও নিবিড় সেতুবন্ধনের এক অনন্য উপায় হচ্ছে কোরবানী। আল্লাহর দেওয়া জীবন ও সম্পদ থেকে আল্লাহর নামে কোন কিছু উৎসর্গ করার নামই হচ্ছে কোরবানী।
কোরবানীর প্রবর্তন কীভাবে, কখন থেকে এবং কোরবানীর মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে মহান রাব্বুল আলামীন আল কুরআনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। আদি মানব হজরত আদমের (আ.) দু’পুত্র হাবিল ও কাবিলের কোরবানীই পৃথিবীর প্রথম কোরবানী। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন_”আদমের দু’পুত্রের (হাবিল ও কাবিল) বৃত্তান্ত তুমি তাদের যথাযথভাবে শুনাও যখন তারা উভয়ে কোরবানী করল। তখন এক জনের কোরবানী কবুল হলো এবং অন্যজনের কবুল হলো না, আল্লাহ মুত্তাকীদের কোরবানী কবুল করেন।” (সূরা মায়িদা, আয়াত-২৭)।
এখানে কোরবানী কবুল হওয়ার জন্য মুত্তাকী বা খোদাভীতিপূর্ণ পরিশুদ্ধ চিত্ততার কথা বলা হয়েছে। হাবিলের মধ্যে এটা ছিল তাই তাঁর কোরবানী আল্লাহর দরবারে কবুল হয়। কিন্তু কাবিলের মধ্যে এর অভাব ছিল, ফলে তার কোরবানী কবুল হয়নি। সে কারণে সে ক্ষিপ্ত হয়ে হাবিলকে হত্যা করল। খোদাভীতি না থাকলে তার কোরবানী তো কবুল হয়ই না, বরং সে একটির পর একটি অন্যায় কাজে প্রলুব্ধ ও ক্ষিপ্ত হয় এটা তারই প্রমাণ। তাই খোদাভীতি বা তাকওয়া শুধু কোরবানী কবুল হওয়ার পূর্বশর্ত নয়, বরং যে কোন ইবাদত কবুল হওয়ার পূর্বশর্ত আদর্শ মুসলমান হওয়া।
এ খোদাভীতি বা তাকওয়ার জীবন্ত প্রতীক ছিলেন আল্লাহর নবী-রাসূলগণ। যুগে যুগে তাঁদের অনুসরণ করে একদল লোক প্রকৃত মুমিন বা আদর্শ মানুষে পরিণত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। কোরবানীর ক্ষেত্রে তাকওয়ার চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছেন মুসলিম মিল্লাতের পিতা হজরত ইবরাহীম (আ.) হজরত ইসমাঈল (আ.) এবং হজরত হাজেরা (আ.)।
আমরা যে কোরবানী করে থাকি তা মুসলিম মিল্লাতের পিতা হজরত ইবরাহীমের (আ.) সুন্নত হিসেবে, আল্লাহর নির্দেশে তাঁর ও তৎপুত্র হজরত ইসমাঈলের (আ.) চরম আত্মোৎসর্গের ঐতিহাসিক স্মৃতিকে স্মরণ করে। স্বামী-স্ত্রী ও পুত্রের চরম আত্মোৎসর্গের স্মৃতিকে স্মরণ করে প্রতিবছর দশই জিলহজ তারিখে হাজীগণ মীনায় এবং দুনিয়ার সর্বত্র সমর্থ মুসলমানগণ জিলহজ মাসের দশ থেকে বার তারিখ পর্যন্ত কোরবানী করে থাকে। হজরত ইবরাহীম (আ.) আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তার প্রাণাধিক পুত্র হজরত ইসমাঈলকে (আ.) নিজ হাতে কোরবানী করার জন্য উদ্যত হয়ে মহান আত্মত্যাগের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। অবশ্য আল্লাহর অশেষ কুদরত ও মেহেরবানীতে হজরত ইসমাঈলের (আ.) পরিবর্তে কোরবানী হয়েছিল বেহেশত থেকে প্রেরিত একটি হৃষ্টপুষ্ট দুম্বা। হজরত ইবরাহীমের (আ.) আত্মত্যাগ বিশ্বের ইতিহাসে এক অনন্য ও অবিস্মরণীয় ঘটনা।
পবিত্র কোরআনের বর্ণনায় ইব্রাহীম (আ.)-এর স্মৃতিকথা বিবৃত হয়েছে এভাবে- অতঃপর সে (ইসমাইল) যখন পিতার সাথে চলাফেরার বয়সে উপনীত হলো, তখন ইব্রাহিম তাকে বলল : বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি, আমি তোমাকে জবাই করছি; এখন তোমার অভিমত কী সেটা ভেবে বল। সে বলল, পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে তাই করুন। আল্লাহ ইচ্ছায় আপনি আমাকে সবরকারী হিসেবে পাবেন। যখন পিতা-পুত্র উভয়ে আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইব্রাহিম তাকে জবাই করার জন্য শায়িত করলেন। তখন আমি তাকে ডেকে বললাম, হে ইব্রাহিম! তুমি তো  স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখালে! আমি এভাবেই সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিয়ে থাকি।
কোরবানী ইতিহাস আত্মত্যাগের ইতিহাস, আত্মোৎসর্গের ইতিহাস। মানবজাতির ইতিহাসে পিতা-মাতা-পুত্রের চরম আত্মোৎসর্গের এরূপ দৃষ্টান্ত আর কখনো দেখা যায় না। তাই আল্লাহ মানবজাতিকে অনুপ্রাণিত করার উদ্দেশ্যে এ চরম ও অত্যুজ্জ্বল আত্মোৎসর্গের স্মৃতিকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছেন ঈদুল আযহা ও কোরবানীর মাধ্যমে।
প্রাক-ইসলামী যুগে মানুষ কোরবানীর করার পর কোরবানীর পশুর গোস্ত আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদন করার জন্য কাবা ঘরের সামনে এনে রেখে দিত, পশুর রক্ত কাবার দেয়ালে লেপ্টে দেওয়া হত। সূরা হজের ৩৭ নং আয়াতে এ কুপ্রথার মূলেৎপাটন করে আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্টভাবে বলেন : কোরবানীর পশুর রক্ত-মাংসের কোন প্রয়োজন আল্লাহর নেই; তিনি যা চান তা হলো কোরবানীকারীর তাকওয়া, আল্লাহর প্রতি একান্ত আনুগত্য ও আল্লাহর প্রতি মু’মিন-চিত্তের একাগ্রতা। হজরত ইবরাহীম (আ.), হজরত ইসমাঈল (আ.) ও হজরত হাজেরার (আ.) মাধ্যমে আল্লাহ এরই পরীক্ষা নিয়েছিলেন।
পশু কোরবানীর মাধ্যমে যুগ যুগ ধরে মুমিনদের এ পরীক্ষার ঐতিহাসিক ধারাই চলে আসছে। কোরবানীকারী পশুর গলায় ছুরি চালিয়ে তার তাকওয়ার পরীক্ষা দেন। আর একথা সুবিদিত যে, স্বার্থপরতা ও কুপ্রবৃত্তির মধ্যে কখনো তাকওয়া বা খোদাভীতির সৃষ্টি হয় না। অতএব, কোরবানী আমাদের এসব মানবিক দুর্বলতার ঊর্ধে ওঠার শিক্ষা দেয়। আত্মশুদ্ধির জন্য যেমন এ ধরনের প্রশিক্ষণ অতীব গুরুত্বপূর্ণ, কল্যাণময়, সুন্দর মানবসমাজ প্রতিষ্ঠার জন্যও তেমনি এটা অপরিহার্য। এদিক দিয়ে কোরবানীর গুরুত্ব ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে অপরিসীম।
আত্মত্যাগের মহিমায় উদ্বুদ্ধ হয়ে যারা আল্লাহর নামে কোরবানী করে তাদের জন্য সীমাহীন সওয়াবের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। পশু কোরবানীর মাধ্যমে আত্মত্যাগের অপূর্ব পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য ও সহানুভূতির গভীর বন্ধনে শান্তির বাতাস বয়। গরিব-দুঃখী, দীনহীন অনাথ এতিম মানুষজন এক দিনের জন্য হলেও নিজেদের অধিকার ফিরে পায়। ঘরে ঘরে জেগে ওঠে দ্বীনি আমেজ।

সর্বশেষ সংবাদ