চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ১০ ইউপি সদস্যের অনাস্থা, পরিষদে অচলাবস্থা

সাইফুর রহমান শামীম, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ঘোগাদহ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও সেচ্ছাচারিতার অভিযোগ এনে পরিষদের ১০ সদস্যের (সংরক্ষিত নারী সদস্যসহ) অনাস্থার বিষয়ে প্রাথমিকভাবে সত্যতা পেয়েছে উপজেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি। তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে। এ অবস্থায় ওই চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় ইউপি সদস্যদের অনাস্থায় পরিষদে অচালবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসক ও ইউএনও বরাবর দেওয়া অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ঘোগাদহ ইউপি চেয়ারম্যান শাহ আলম মিয়া করোনা দুর্যোগকালীন ইউনিয়নের হতদরিদ্রদের জন্য বরাদ্দ করা ত্রাণ সহায়তা ইউপি সদস্যদের সঙ্গে কোনও রকম পরামর্শ না করে সেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে নামমাত্র বন্টন করে অধিকাংশ বরাদ্দ আত্মসাৎ করেছেন। এতে ইউনিয়নের ১, ২, ৩ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কোনও হতদরিদ্র ওই বরাদ্দের ত্রাণসামগ্রী পাননি।
অভিযোগে আরও বলা হয়, চেয়ারম্যান ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির মাধ্যমে ইউনিয়নের আরাজী কুমরপুর-রসুলপুর খেয়াঘাট ইজারার নামে তার নিজস্ব লোকদের দিলেও ইজারার টাকা ইউনিয়ন পরিষদের তহবিলে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করেছেন।
২০১৯-২০ অর্থ বছরে বাস্তাবায়নকৃত ২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরের এলজিএসপি-৩ এর আওতায় ‘ঘোগাদহ শিশু পার্কের গেটের পাল্লাসহ এসএস পাইপের রেলিং ও বসার জন্য গোল চত্বর ঘর এবং বিভিন্ন ভাস্কর্য ও পাখি স্থাপন করণ’ প্রকল্পে ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্যকে প্রকল্পের সভাপতি দেখিয়ে তার স্বাক্ষর জাল করে প্রকল্পের প্রায় ৯ লাখ টাকা চেয়ারম্যান উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছেন।
এছাড়াও ২০১৬-১৭ এবং ২০১৭-১৮ বছরে (বাস্তবায়ন ২০১৮-১৯) ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়াডের্র এলজিএসপি-৩ এর দুটি প্রকল্পে ইউপি সদস্য নুরুল আমিনকে সভাপতি দেখিয়ে তার (ইউপি সদস্যের) স্বাক্ষর জাল করে প্রকল্পের প্রায় চার লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন চেয়ারম্যান। এসব অভিযোগ ছাড়াও আইনের কোনও বিধি বিধানের তোয়াক্কা না করে ইউনিয়নের শতবর্ষী বৃক্ষসহ ১৩টি গাছ কেটে নিলাম ছাড়াই চেয়ারম্যান তা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন ইউপি সদস্যরা। এসব অভিযোগ ও নানা অনিয়মের প্রতিবাদে গত এপ্রিলে ঘোগাদহ বাজার প্রাঙ্গণে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে মানববন্ধনসহ অনাস্থা প্রস্তাব আনেন ১০ ইউপি সদস্য।
গাছ কেটে নেওয়া হচ্ছেএর পরিপ্রেক্ষিতে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে (স্মারক নং ২৯১, তারিখ: ০৫.০৫.২০২০ খ্রি.) উপজেলা কৃষি অফিসারের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়ে স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন-২০০৯ এর ধারা ৩৯ এর ৫ উপধারা (৩) অনুযায়ী, গত ১৮ জুলাই সভা আহ্বান করেন। এই সভায় উপস্থিত ১২ জন (সংরক্ষিত তিন নারী ইউপি সদস্যসহ) ইউপি সদস্যের মধ্যে ১০ ইউপি সদস্য চেয়ারম্যান শাহ আলম মিয়ার বিরুদ্ধে অনাস্থার বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করে তার প্রতি অনাস্থা ভোট প্রদান করেন। তবে লিখিত চিঠি পাওয়ার পরও ওই সভায় চেয়ারম্যান উপস্থিত ছিলেন না বলে সভা সূত্রে জানা গেছে।
নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে মিথ্যা দাবি করে অভিযুক্ত চেয়ারম্যান শাহ আলম মিয়া বলেন, ‘ইউপি সদস্যদের অভিযোগ মিথ্যা। ওরা যে অভিযোগ দেয় দিক।’
‘ওরা ১০ জন না চাইলে কি আমার চেয়ারম্যানি শেষ হয়ে যাবে’—এমন প্রশ্ন রেখে চেয়ারম্যান বলেন, ‘তদন্ত কমিটি অভিযোগের সত্যতা পায়নি।’
জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা ও উপজেলা কৃষি অফিসার মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে প্রায় দুই মাস আগে প্রতিবেদন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর প্রেরণ করা হয়েছে।’
অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার প্রশ্নে এই কর্মকর্তা স্পষ্ট কোনও মন্তব্য করতে রাজি না হলেও তিনি জানান, অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পরই কেবল স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন-২০০৯ এর ধারা ৩৯ এর ৫ উপধারা (৩) অনুযায়ী সভা আহ্বান করা হয়।
ইউএনও (ভারপ্রাপ্ত) মো. ময়নুল ইসলাম জানান, তদন্ত কর্মকর্তার প্রতিবেদনটি প্রায় দুই মাস আগে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসক বরাবর পাঠানো হয়েছে। এদিকে অনাস্থা প্রস্তাব ও তদন্ত কর্মকর্তার প্রতিবেদন জমা হওয়ার দুই মাস পার হলেও চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে কোনও আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়ায় হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিযাগকারী ইউপি সদস্যরা। তারা বলছেন, ‘উদ্দেশ্যমূলকভাবে জেলা প্রশাসন থেকে ওই প্রতিবেদন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে না পাঠিয়ে চেয়ারম্যানের সঙ্গে আমাদের আপস করতে বলা হচ্ছে। তার সঙ্গে আপসের অর্থ হলো অন্যায়ের সঙ্গে আপস করা। এটা সম্ভব নয়। আমরা ন্যায় ও আইনসঙ্গত বিচার চাই।’
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, ‘স্থানীয় পর্যায়ে তদন্ত করে আমার কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রক্রিয়াগত কিছু বিষয় ছাড়াও তাদের আরও কিছু অভিযোগ রয়েছে। সেগুলো তদন্ত করে তারপর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।’
চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার প্রশ্নে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘সেগুলো এখনও তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে।