ছাত্র ইউনিয়ন এর ৪০তম জাতীয় সম্মেলন সফল করতে বগুড়ায় প্রচার মিছিল

লড়াই – সংগ্রাম, শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠা, আন্দোলনের শ্রতিগার, মানবমুক্তির অগ্রণী সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন এর জাতীয় সম্মেলন  আগামীকাল ১৯নভেম্বর শহীদ মঈন হোসেন রাজু ভাষ্কর্যের পাদদেশে উদ্বোধন হবে। সম্মেলন সফল করতে বগুড়ায় ছাত্র ইউনিয়ন এর প্রচার মিছিল শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে টেম্পল রোড সাতমাথাস্থ জেলা কার্যালয়ের সামনে সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জেলা  সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও পরিচালনা করেন সাধারণ সম্পাদক সোহানুর রহমান।
সমাবেশে বক্তব্য রাখেন ছাত্র ইউনিয়ন বগুড়া জেলা সংসদের সাংগঠনিক সম্পাদক ছাব্বির হোসেন, কোষাধ্যক্ষ বায়োজিদ হোসেন, দপ্তর সম্পাদক নিয়ামুল তরফদার আকিব,  সরকারি আজিজুল হক কলেজ সংসদের সভাপতি আরমানুর রশিদ আকাশ, সরকারি শাহ সুলতান কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন।
বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন: অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ
১৯৫২ সালের ২৬ এপ্রিল অগ্নিঝরা দিনে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চেতনা নিয়ে জন্ম হয় বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের। সেই থেকে নীল পতাকাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে শিক্ষা, শান্তি, ঐক্য, প্রগতি – এই চার মূলনীতি কে বুকে ধারণ করে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের অবিরাম পথ চলা। জন্ম লগ্ন থেকেই একমুখী, আধুনিক, বিজ্ঞান ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা, শোষণ নিপীড়ন ও বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সমাজতান্ত্রিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে দুর্বার গতিতে ছুটে চলছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন নামক এই গণ ছাত্রসংগঠনটি। সুদীর্ঘ ৬৮ বছরের বন্ধুর পথ পরিক্রমায় স্বাধীনতাপূর্ব ও স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে লেজুড়বৃত্তি হীন একমাত্র প্রগতিবাদী ছাত্র গণসংগঠন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হয় ছাত্র ইউনিয়ন। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ছয় দফা পরবর্তী ছাত্রসমাজের ১১ দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ প্রতিটি আন্দোলনে ছাত্র ইউনিয়নের অসংখ্য নেতাকর্মী শহীদ হন। গভীর রাজনৈতিক প্রত্যক্ষণ থেকে দেখা যায়, পুলিশের গুলিতে ছাত্র ইউনিয়ন নেতা আসাদের আত্মদানের মধ্য দিয়ে গণঅভ্যুত্থান চূড়ান্ত রূপ লাভ করে এবং যার ফলশ্রুতিতে সামরিক আইয়ুব খান সরকারের পতন ঘটে। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে আসাদের আত্মদান গ্রাম ও শহর অঞ্চলে শ্রেণী চেতনার উন্মেষ ও শ্রেণীসংগ্রাম বিকাশের পথকে প্রশস্ত করে।
আমাদের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তীকালে নব্বইয়ের গণআন্দোলন সহ প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে ডাকসুর অবদান অনস্বীকার্য। আর ডাকসুর সুদীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাসের সাথে লেপ্টে আছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের নাম। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনে ডাকসুর অবদানকে যেমন অস্বীকার করা যায় না ঠিক তেমনি বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন নামক গণসংঘটনটির অবদানও অনস্বীকার্য। ১৯৭১ সালের মার্চের শুরু থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্বে পরিচালিত হয় ডামি বন্দুক দিয়ে যুদ্ধ প্রশিক্ষণ ও গেরিলা ট্রেনিং এবং প্রয়াত বিপ্লবীদের নামে গড়ে তোলা হয় আলাদা আলাদা ব্রিগেড, যেখানে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের নারীকর্মীরাও অংশগ্রহণ করে। প্রতিটি জেলায় ও থানায় সংগ্রাম কমিটি ও গণবাহিনী গঠন করার মাধ্যমে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালিয়ে যেতে থাকে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন। ন্যাপ কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে এক বিশাল গেরিলা বাহিনী যার অবদানকে অস্বীকার করলে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করা হবে। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের অবদান ও কৃতিত্ব যেন এক মহাকাব্য যা স্বল্প পরিসরে বিবৃত করা সম্ভব নয়।
স্বাধীনতা পরবর্তী তেহাত্তর সালে সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ভিয়েতনাম আগ্রাসনের সময় বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের বিপ্লবীরা ভিয়েতনামের মুক্তিকামী মানুষের স্বাধীনতার পক্ষে তুমুল আন্দোলন গড়ে তোলেন।বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের দুই তরুণ সহযোদ্ধা মতিউল ও কাদের তাদের তাজা প্রাণ বিলিয়ে দিয়ে সেদিনের সেই ভিয়েতনামের স্বাধীনতাকামী মানুষের পক্ষে অকুণ্ঠ সমর্থন ব্যক্ত করুন যা বিপ্লবীদের ইতিহাসে চির অক্ষয় হয়ে থাকবে। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সেই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ভিয়েতনাম সরকার মতিউল ও কাদেরকে জাতীয় বীরের সম্মানে ভূষিত করেন। পচাত্তরের ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের প্রথম প্রতিবাদকারী ছিলেন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের নেতা কর্মীরা, ইতিহাস সে কথাই বলে! ৭৫ পরবর্তী ছাত্র রাজনীতিতে নেমে আসে এক কালো ছায়া। বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন দলগুলো ছাত্রদের হাতে কলমের পরিবর্তে তুলে দেয় অস্ত্র আর মাদক। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অস্ত্রের ঝনঝনানি প্রকট হয়ে ওঠে। সমস্ত অপশক্তিকে  রুখে দিতে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে সন্ত্রাসবিরোধী গণতান্ত্রিক ছাত্র ঐক্য। ১৯৯২ সালের ৩ মার্চ ছাত্রলীগ বনাম ছাত্রদলের বন্দুকযুদ্ধের সময় সন্ত্রাসবিরোধী গণতান্ত্রিক ছাত্র ঐক্যের মিছিলে ছাত্রদলের গুলিবর্ষনে শহীদ হন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন  নেতা মঈন হোসেন রাজু যার স্মৃতি রক্ষার্থে টিএসসির মোড়ে স্থাপিত হয় রাজু স্মারক ভাস্কর্য।
১৯৯৮ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ নেতা জসিম উদ্দিন মানিক ও তার সহযোগীরা ধর্ষণের মহোৎসবে মেতে ওঠলে সেখানেও বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন অপরাপর বাম ছাত্র সংগঠন সমূহ ও সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে রুখে দাঁড়ায়, ক্ষমতাসীন দলের ধর্ষকদের বিরুদ্ধে, গড়ে তোলে এক ঐতিহাসিক ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলন। যে আন্দোলনের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সেদিনের সেই আপোষহীন আন্দোলনের ফলে সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের নেতা মানিকের ছাত্রত্ব বাতিলসহ সহযোগী বেশ কয়েকজনকে বহিষ্কার করতে বাধ্য হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন নিপীড়নবিরোধী নীতিমালা প্রণয়নের নির্দেশ দেন উচ্চ আদালত, যা আজও বাস্তবায়িত হয়নি।
এবছর মার্চ মাসে করোনা সংক্রমণ শুরু হলে  বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের নেতা কর্মীরা সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয় করোনা যোদ্ধা হিসেবে। শুরু থেকেই সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ, স্যানিটাইজার তৈরি ও বিতরণ, করোনা দুর্গত কর্মহীন হয়ে যাওয়া হাজার হাজার নিম্নআয়ের মানুষের জন্য খাদ্যদ্রব্য ও নগদ অর্থ বিতরণের মাধ্যমে বিপ্লবের মানবিক রূপে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন নামক সংগঠনটি। শুধু তাই নয়, করোনাকালীন ছাত্রছাত্রীদের টিউশন ফ্রি মওকুফসহ নানা দাবিতে সারাদেশে আন্দোলন গড়ে তুলে ছাত্র ইউনিয়ন।
সাম্প্রতিককালে নোয়াখালী ও সিলেট সহ সারা দেশে আবারো ধর্ষণ মাথাচাড়া দিয়ে উঠলে শাহবাগের প্রজন্ম চত্বর থেকে সারা বাংলায় ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলনের ডাক দেয় বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন। এ ডাকে সাড়া দিয়ে অপরাপর বাম ছাত্রসংগঠন সমূহ ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন সমূহ আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে। গত কয়েকদিন আগে লালমনিরহাটে ধর্মগ্রন্থ অবমাননার মিথ্যা অপবাদে শিক্ষককে পিটিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করা হলে ও কুমিল্লার মুরাদনগরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে হিন্দুদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করলে অন্যান্য ছাত্র সংগঠন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করলেও বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন এসবের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানায় ও আন্দোলন জারি রাখে। আর এভাবেই কালের পরিক্রমায় বায়ান্ন থেকে অদ্যাবধি পর্যন্ত মাস্টারদা সূর্যসেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার প্রমূখ বিপ্লবীদের যোগ্য উত্তরসূরী, অসাম্প্রদায়িক বিপ্লবী চেতনার ধারক ও বাহক বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে। ওরা আছে বলেই আমরা এখনো স্বপ্ন দেখি, একটি অসাম্প্রদায়িক, শোষণমুক্ত, সুখী ও স্বনির্ভর বাংলাদেশের।আগামীকাল থেকে শুরু হচ্ছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের ৪০ তম জাতীয় সম্মেলন। সম্মেলন সফল হোক, সার্থক হোক।
জয়তু বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন।

সর্বশেষ সংবাদ