অনলাইনে যৌন হয়রানি: সমাধান করবে কে?

প্রেমে প্রত্যাখাত হয়ে সহপাঠীর ফোন নম্বর পর্নসাইটে দিয়ে দেয় সানি (ছদ্মনাম)। এরপর শুরু হয় একের পর এক ফোন আসা আর হয়রানিমূলক কথা। সাড়া না দিলে শুরু হয় অকথ্য গালি। অবশেষে ফোন নম্বর বদলে রক্ষা পান সায়লা (ছদ্মনাম)। মাঝের পুরো সময়টা যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন সায়লা।

একই অফিসে কর্মরত পুরুষ সহকর্মী ইনবক্সে নানা মেসেজ দেন। ‘আজ সুন্দর লাগছে’, ‘অফিস শেষে ঘুরতে যাবেন?’ ইনিয়ে বিনিয়ে অনেক প্রস্তাব। সরল মনে একবার দুবার সাড়া দিয়ে ফেললে শুরু হয় প্রস্তাবের দ্বিতীয় পর্ব। তারপর ইনবক্স করা শুরু হয় অফিস টাইমের পরও। এমনকি মধ্যরাতেও বলতে শুরু করেন ওই নারী সহকর্মীর কোন কোন বিষয় তার ভালো লাগে ইত্যাদি। শুরুতে অফিসের কলিগ ভেবে চুপ থাকেন নারী সহকর্মীটি। কিন্তু এই চুপ থাকাকে দুর্বলতা ভেবে ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে হয়রানির মাত্রা। একসময় পুরুষ সহকর্মীটিকে ‘ব্লক’ করতে বাধ্য হন ওই নারী। তারপরও চলে ফেইক আইডির দৌরাত্ম। অফিসে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করলেও অনেক সময় ফল হয় উল্টো। বাকি সহকর্মীদের হাসাহাসির মুখে পড়েন নারীটি। অফিসের কাজে পারফরমেন্স ভালো হলে পার পেয়ে যান পুরুষ সহকর্মী। আর তখন ওই নারীকে এমনও শুনতে হয় যে, ‘ছেলেরাতো এমন একটু করবেই’। এ অবস্থায় চাকরি ছেড়েই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন ওই নারীকর্মী।

১৬ বছরের নাবিলার (ছদ্মনাম) সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ২১ বছরের রায়হানের (ছদ্মনাম)। নানা সময় তাদের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি তুলে রাখে রায়হান। এরপর যখন তখন তাকে বিভিন্ন হোটেলে দেখা করতে আমন্ত্রণ জানাতে থাকে ও। নাবিলা অস্বীকৃতি জানালেই ছবিগুলো ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। বাবা মায়ের ভয়ে নাবিলা বাধ্য হয়ে কথিত প্রেমিকের সঙ্গে দেখা করতে গেলে রায়হানের বন্ধুদের দ্বারাও যৌন হয়রানির শিকার হয়। এমনকি বাসায় ফেরার আগেই অনলাইনে তার ছবি ছেড়ে দেয় কথিত প্রেমিক। কেন আগে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল সেই ক্ষোভ থেকেই এমন ‘প্রতিশোধ’ নেয় রায়হান।

অনলাইনের বিভিন্ন প্লাটফর্ম নিয়মিত ব্যবহার করছেন এমন নারীদের কাছ থেকে এ ধরনের নানা হয়রানির খবর পাওয়া যায়। কখনো তারা অভিযোগ করেন, কখনো চুপ থাকেন। ভুক্তভোগী নারীরা বলছেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোথায় অভিযোগ করবেন এবং কতদিনে বিচার পাবেন এসব ভেবে আর আগাতে চান না। নম্বর বদলে ও আইডি বন্ধ করেই বাঁচতে চান। কিন্তু ভয়াবহ মানসিক অস্থিরতা থেকে বাঁচতে পারেন না সহসা।

এই পরিস্থিতিতে সাইবার স্পেসে শুধু নারী ভিকটিমদের সহায়তার জন্য ‘police cyber support for women’ নামের একটি সেবা উদ্বোধন করেন আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ। সেখানে জানানো হয়, অনলাইন প্লাটফর্ম ব্যবহারকারী ৬৮ শতাংশ নারী সাইবার অপরাধের শিকার হন। এই ভিকটিমদের বয়স ১৬ থেকে ২৪ বছরের মধ্যে। এখন হয়রানির বিচার পেতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করার সুযোগ তৈরি হওয়াতে অপরাধের পরিমাণ কমে আসবে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ।

আইজিপি ড. বেনজির আহমেদ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জানান, এখন পর্যন্ত সাইবার অ্যাক্টে ৬ হাজার ৯৯টি মামলা হয়েছে। এই অপরাধগুলো নিয়ে ডিএমপি, ডিবি, সিআইডি, পিবিআই, কাজ করছে। আইজিপি জানান, ‘আপনারা যারা সাইবার জগতে প্রবেশ করেছেন, সাইবার জগতের ঝুঁকি বিষয়ে সচেতন হয়েই ব্যবহার করবেন। তারপরও যদি কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত সমস্যা তৈরি হয় সে বিষয়ে আমরা কাজ করব।’ এক্ষেত্রে ভিকটিমের সর্বোচ্চ গোপনীয়তা রক্ষা করা হবে বলেও জানানো হয়।

পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন ইউনিটটি টেকনিক্যাল সহযোগিতা ও করণীয় বিষয়ে পরামর্শ দিতে কাজ করবে উল্লেখ করে কর্মকর্তারা বলছেন, কেবল যৌন হয়রানি নয়, সাইবার জগতের সব ধরনের হয়রানির শিকার নারীদের আমরা সেবা দেব।

সেবার ধরন কেমন হবে জানতে চাইলে তারা বলেন, আমাদের পরিকল্পনা হলো, টেকনিক্যাল সমস্যার ক্ষেত্রে সমাধান বলে দেওয়া যাতে ভিকটিম নিজে নিজে সমাধান করতে পারেন। অপরাধ সংঘটিত হলে তাকে আইনি পরামর্শ দেওয়া এবং তদন্তকাজে কর্মকর্তাকে সহায়তা দেওয়া হবে। ভিকটিম নারী চাইলে তিনটি মাধ্যমে এই ইউনিটের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন। ফেসবুক পেজের ইনবক্স, ইমেইল বা হটলাইনে ফোন করে অভিযোগ জানাতে পারবেন।

সাহায্য বা পরামর্শের জন্য আগেও একাধিক হটলাইন ছিল। এরপরও আরেকটি হটলাইন বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে উল্লেখ করে উই ক্যান-এর নির্বাহী সমন্বয়ক জিনাত আরা হক বলেন, ভিকটিম নারী তার সহায়তা কীভাবে পেতে চায় সেই হোমওয়ার্কটা খুব জরুরি। আমরা চাই সংবেদনশীলতার সঙ্গে পুলিশ ভিকটিমের কথা শুনুক এবং সমাধানের রাস্তা দেখাক। আমার মনে হয়েছে এটা পুলিশের পক্ষ থেকে একটি উদ্যোগ নেওয়া, যাতে বোঝা যাবে যে তারাও নারী নির্যাতনের ইস্যুটি নিয়ে চিন্তিত।

সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম ডিভিশনের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (এডিসি) নাজমুল ইসলাম মনে করেন কেবল নারীদের জন্য এ ধরনের উদ্যোগ রাখা কাজের। তিনি বলেন, আমরা সাইবার জগতে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে কাজ করি। এই বিশেষ ইউনিট কেবল নারীদের নিয়ে কাজ করবে।

উল্লেখ্য, হাইকোর্টের রায়ে যৌন নিপীড়নের সংজ্ঞায় বলা হয়, শারীরিক ও মানসিক যে কোনও নির্যাতনই যৌন হয়রানির মধ্যে পড়বে। ই-মেইল, এসএমএস, টেলিফোনে বিড়ম্বনা, পর্নোগ্রাফি, যে কোনো ধরনের অশালীন চিত্র দেখানো, অশালীন উক্তি করাসহ কাউকে ইঙ্গিতপূর্ণভাবে সুন্দরি বলাও যৌন হয়রানির পর্যায়ে পড়ে। হাইকোর্টের এ নির্দেশনা আইনে রূপান্তর না হওয়া পর্যন্ত সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এ নির্দেশনাই আইন হিসেবে কাজ করবে। সব সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এ নীতিমালা প্রযোজ্য হবে।