বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যবাহী ঘানি শিল্প

শিবগঞ্জ (বগুড়া) প্রতিনিধি: আধুনিক সভ্যতার ক্রমবিকাশে ঘানি শিল্প এখন বিলুপ্তির পথে।  রবিবার সরেজমিনে প্রতিয়মান হয়, বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার সরিষারতেল উৎপাদনকারী খুলু সম্প্রদায় হারিয়েছে তাদের ঐতিহ্য। ফলে খাঁটি সরিষার তেল প্রাপ্তি হতে বঞ্চিত হচ্ছে উপজেলার সাধারণ মানুষ।
আগে দিনরাত গরু দিয়ে কাঠের ঘানির সাহায্যে ফোটায় ফোটায় নিংড়ানো খাঁটি সরিষার তেল বিভিন্ন গ্রাম-গঞ্জের হাটে-বাজারে  মাটির হাড়িতে  করে বিক্রি করা হতো। এ তেল বিক্রি করেই জীবন-জীবিকা নির্বাহ করতেন খুলু সম্প্রদায়। যুগের পরিবর্তনে উপজেলায় এখন শিল্পটি বিলুপ্ত প্রায়।
দিন বদলের সাথে সাথে আধুনিকতার ছোঁয়ায় নতুন নতুন প্রযুক্তি শিল্পে ব্যবহার হলেও বগুড়ার শিবগঞ্জের পৌর এলাকার কলুমগাড়ি গ্রামে এখনো শিল্পটি বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন আলহাজ্ব আবু জাফর সিদ্দিক। তিনি বলেন, বংশ পরমপরায় দের’শ বছর যাবৎ তারা এ পেশায় আছেন। উপজেলার ময়দানহাট্টা, মোকামতলা, কিচক, আটমুল, বুড়িগঞ্জ বিহারহাটসহ এলাকার বিভিন্ন এলাকায় এক সময় ঘানিশিল্পের প্রচলন ছিলো। এখন আর উপজেলার শিল্পটি চোখে পরেনা। আবু জাফর নিজে তিন পুরুষ থেকে দেখছেন এ পেশা। তার দাদা মৃত মানিক উল্লাহ ঘানির খাঁটি সরিষার তেল বিক্রি করতেন। দাদার পর বাবা মৃত হোসেন আলীও একই পেষার জীবিকা নির্বাহ করেছেন। বর্তমানে সত্তর বছর বয়সে এসেও তিনি খুলু সম্প্রদায়ের এ পেশা এখনো ধরে রেখেছেন। বিলুপ্তির পথে শিল্পটি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। বর্তমানে তার দুই ছেলে পাঁচ মেয়ে ও স্ত্রী রোকেয়া বেগমকে নিয়ে তার সংসার। বাপ-দাদার পেশা ছাড়তে পারেননি তিনি। এখনো আকড়ে ধরে রেখেছেন পেশাটিকে।
সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঘানিতে তেল মারায়ের কাজ করছেন আবু জাফর সিদ্দিক। তার এ পেশার সাথে ছেলে মেয়ে কেহই জড়িত না হলেও স্ত্রী রোকেয়া বেগম ৪৮ বছর যাবৎ প্রতিনিয়তই  স্বামীকে ঘানিতে সারিষা মাড়ায়ের সহযোগিতা করছেন। খুলু আবু জাফর সাংসারিক অন্য কাজে ব্যস্ত থাকলে তার অবর্তমানে  স্ত্রী তেল মারায়ের কাজ করে থাকেন। তার ঘানিতে একমন সরিষা থেকে ১৫ থেকে ১৬ লিটার তেল উৎপাদন করতে পারেন। তিনি প্রতিদিন ২৭ কেজি সরিষা ঘানিতে মাড়াই করে গড়ে ৮ থেকে ৯ লিটার তেল উৎপাদন করেন।
আবু জাফরের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, ঘানির সাথে একটি করে গরুর চোখ বেঁধে কাঁধে জোয়াল লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। পরে গরুটি দিনভর চরকীর মতো আপন মনে ঘুরতে থাকে। তখন ঘানির নল দিয়ে টিপটিপ করে তেল বের হতে থাকে। ওই তেল মাটির কলসি করে মহাস্থান হাটে নিয়ে বিক্রি করে। বাজারে মেশিনের সরিষা মাড়ানোর তেলের চেয়ে তার তেলের চাহিদা  অনেক বেশি। তিনি প্রতি লিটার তেল বিক্রি করেন ১৮০ টাকা দরে।  জাফরের পরিচিত কিছু ক্রেতা আছেন তারাই প্রতিনিয়ত তার এই খাঁটি তেল কিনে থাকেন। কৃত্রিম সরিষার তেল বাজার দখল করলেও  শিবগঞ্জ উপজেলার খুলু আবু জাফরের তেলের কদর এখনো বেশ।  ফলে খাঁটি সরিষা তেলের স্বাদ পাচ্ছেন এলাকার সাধারণ মানুষ।
শিবগঞ্জের মহাস্থান হাটে তেল কিনতে আসা ক্রেতা তৈয়ুব আলী বলেন, আমি জাফরের নিকট থেকে প্রায় চল্লিশ বছর যাবৎ সরিষার তেল কিনছি। খুব ভালো তেল, বাজারে কৃত্রিম সরিষার তেলের চেয়ে দাম একটু বেশি হলেও আমি এই তেলই ক্রয় করি। আমার পরিবার এই তেল পছন্দ করে। তবে অনেকের মতে এখনও খাঁটি সরিষার তেল বলতে ঘানির তেলকেই বুঝায়। ঘানির তেলের এই ব্যাপক চাহিদার পরও আধুনিক প্রযুক্তির প্রসারে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী ঘানিশিল্পটি।

সর্বশেষ সংবাদ