বগুড়ায় তিন বছরে সাইবার পুলিশের সাফল্য

সাজ্জাদ হোসেন পল্লব:স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখে শান্তিতে সংসার করছিলেন বগুড়া শহরের এক নারী। ফেসবুকে পরিচয় মালয়েশিয়া প্রবাসী যুবক রায়হানের সাথে। ফেসবুক বন্ধু পরিচয়ে যোগাযোগ থেকে জড়িয়ে পড়েন পরকীয়ায়। সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে এবং স্বামী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চলে গেলে একা বাড়িতে ভিডিও কলে চলতো তাদের পরকীয়া। এভাবে এক বছর পেরিয়ে যায়। হঠাৎ রায়হান যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। কোন ভাবেই রায়হানের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারেন না ওই গৃহবধূ। এক সময় ভুলে যেতে থাকেন রায়হানকে। একদিন দেখতে পারেন তার ছবি দিয়ে একটি নতুন আইডি। তার পরিচিত অনেকেই অ্যাড হয়েছেন সেই আইডির সাথে। মনে মনে সন্দেহ করেন রায়হানকে। ইতিমধ্যে পরিচিতজনরা জানায় ওই আইডি থেকে তার নগ্ন দেহের ছবি পাঠানো হচ্ছে। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে তার।নিজের জীবন ও সংসার তছনছ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এরই মধ্যে স্বামীর কানে চলে যায় স্ত্রীর নগ্ন দেহের ছবি। সংসারে শুরু হয় চরম অশান্তি। একদিন ওই নারীর স্বামী চায়ের দোকানে বসে পত্রিকা পড়ছেন আর ভাবছেন এই স্ত্রীকে নিয়ে সংসার করবেন না। হঠাৎ করে পত্রিকায় দেখতে পারেন বগুড়ায় সাইবার পুলিশের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু শিরোনামে একটি সংবাদ। সংবাদটি মনোযোগ দিয়ে পড়ে বুঝতে পারেন তার স্ত্রীর ঘটনাটিও সাইবার অপরাধ। দেরি না করে একজন পরিচিত পুলিশের সহযোগিতায় চলে আসেন সাইবার পুলিশের কাছে। সেখানে বিস্তারিত শোনার পর পর্যালোচনা করে দেখা যায় রায়হান নামের ওই যুবক মালেশিয়ায় বসে ফেক আইডি পরিচালনা করছেন। তাকে ধরে আনাও সম্ভব না। পরে তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে ওই ফেক আইডি সহ রায়হানের সকল আইডি বন্ধ করে দেয় সাইবার পুলিশ। ফলে স্বস্তি ফিরে ওই নারীর মনে। স্বামী- স্ত্রীর ভুল বোঝাবুঝির অবসান ও সাইবার পুলিশের কাউন্সিলিং এর মাধ্যমে। এই ঘটনার তিন বছর খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নতুন ভাবে জীবন শুরু করেছেন তারা। অপরিচিত কারো সাথে ফোনে কিংবা অনলাইনে কথা বলেন না ওই নারী। সুখে শান্তিতে চলছে তাদের সংসার জীবন।আর গত তিন বছরে দুই শতাধিক সাইবার অপরাধের নিষ্পত্তি করেছে বগুড়া সাইবার পুলিশ। এসব অভিযোগের মধ্যে বেশ কয়েকজন গৃহিণী ছাড়াও স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীদের সংখ্যাই বেশি। এছাড়াও বঙ্গবন্ধু, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী সভার সদস্যদের নামে অপপ্রচার, পদ্মা সেতু নিয়ে গুজব ছড়ানোর মত অপরাধীদের গ্রেফতার করেছে সাইবার পুলিশ।গতকাল রবিবার বগুড়ার পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভুঞা এতথ্য জানান।বগুড়ার পুলিশ সুপারের উদ্যোগে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বগুড়ায় পরীক্ষামূলক ভাবে সাইবার পুলিশের কার্যক্রম শুরু হয়। শুরুতেই ব্যাপক সাড়া পড়ায় ২০১৯ সালের ২৪ জানুয়ারি রাজশাহী রেঞ্জের তৎকালীন ডিআইজি এম খুরশীদ হোসেন বগুড়া পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে ‘সাইবার পুলিশ বগুড়া’ ইউনিটের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম উদ্বোধন করেন।ফেসবুকে গুজব রটানো, রাষ্ট্র বিরোধী প্রচার জঙ্গি তৎপরতাসহ সাইবার অপরাধ দমনে তৎপর হয়ে ওঠে সাইবার পুলিশ ইউনিট। একের পর এক সাইবার অপরাধী গ্রেফতার হতে থাকায় জনগণের আস্থা অর্জন করে সাইবার পুলিশ বগুড়া ইউনিট। বিশেষ করে ফেসবুক বা বিভিন্ন অনলাইন যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতারণার শিকার নারীরা তাদের অভিযোগ নিয়ে আসতে শুরু করে সাইবার পুলিশের কাছে। তাদের পরিচয় গোপন রেখে এবং অনেকের পরিবারকে না জানিয়ে সমস্যা সমাধান করেন সাইবার পুলিশ। ফলে অনেকের সংসার রক্ষা হওয়ার পাশাপাশি রক্ষা হয় সামাজিক মান মর্যাদা।বগুড়ার পুলিশ সুপার জানান, সাইবার পুলিশের কার্যক্রম শুরুর পর থেকে এপর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়েছে-২২০টি অভিযোগ। মামলা হয়েছে-৩৫টি এবং অভিযোগকারী মামলা না করায় বিকল্পভাবে নিষ্পত্তি করা হয় ১৮৫টি অভিযোগ। ১৮৫টি অধিকাংশই স্কুল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাথী, গৃহবধূ রয়েছেন। যেগুলো মামলা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে সরকারি ওয়েবসাইট হ্যাক, ক্রিপ্টোকারেন্সি, বঙ্গবন্ধু, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীসভার নামে অপপ্রচার, পদ্মা সেতু নিয়ে গুজব ও রাষ্ট্র বিরোধী প্রচারণা, প্রতারণামূলক অর্থ হাতিয়ে নেওয়া, কলেজছাত্রীর ফেসবুক আইডি হ্যাক করে ইউটিউবে ছবি ও ভিডিও প্রকাশ, পুলিশ বাহিনীকে গালিগালাজ করে ফেসবুকে লাইভ, সেনাবাহিনীর নামে ফেসবুক আইডি খুলে ব্যবহার, ব্যাংক লোন দেওয়ার নামে প্রতারণা, মহানবী (স.) কে নিয়ে কটূক্তি উল্লেখযোগ্য।

সর্বশেষ সংবাদ