নন্দীগ্রামের মাঠ কাঁপানো খেলোয়াড় ফেরদৌসের এখন মানবেতর জীবনযাপন

নাজমুল হুদা, নন্দীগ্রাম (বগুড়া) প্রতিনিধিঃ বগুড়ার নন্দীগ্রামের মাঠ কাঁপানো ফুটবল খেলোয়াড় ফেরদৌসের এখন মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। ৮০ দশকের ফুটবল ভক্তদের কাছে খুব পরিচিত নাম ফেরদৌস টিম। সে নিজেই এফএসসি নামে ফুটবল খেলোয়াড় সংগঠন গড়ে তুলেছিলো। যার পুরোনাম ফেরদৌস স্পোর্টিং ক্লাব। শুধু নন্দীগ্রামেই সীমাবদ্ধ ছিলো না। সমগ্র উত্তরবঙ্গসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ফুটবল খেলোয়াড় হিসেবে খ্যাত ছিলো ফেরদৌস ও তার টিম। যে টিমের সংগঠক ও অধিনায়ক ছিলেন ফেরদৌস রহমান নিজেই। দৃষ্টিনন্দন ক্রীড়া নৈপুণ্য দীর্ঘ সময় দর্শকদের মাঠে ধরে রাখতো এই খেলোয়াড়। একটা সময় ছিলো ফেরদৌস টিমের খেলা দেখার জন্য হাজার হাজার দর্শকের উৎসাহ। তেমনি ফুটবল মাঠে উপস্থিত হতো। খেলার মাঠে যখন ফেরদৌসের পায়ে বল আসে তখন দর্শকদের করতালি ও উম্মাদনায় কেঁপে উঠে মাঠ। দর্শকদের ভাবনা এই বুঝি গোল হলো। ফেরদৌস টিম নিয়ে ও ব্যক্তিগতভাবে উত্তরবঙ্গসহ দেশের বিভিন্ন জেলার বড়বড় মাঠে ফুটবল খেলতেন। তিনি ঢাকার ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের হয়েও অনেকবার ফুটবল ম্যাচ খেলেছেন। কৃতী এই ফুটবল খেলোয়াড় বেশিরভাগ খেলায় জয়লাভ করেছে। টিমের হয়ে এবং ব্যক্তিগতভাবে পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার। অনেক খেলায় সে একক প্রচেষ্টায় দলকে জয়ী করতে সক্ষম হয়েছেন। ভাগ্যের কী পরিহাস! বাস্তব জীবনে এই খেলোয়াড় বারবার পরাজিত হচ্ছে। ফুটবলের জন্য নিজের সহায় সম্পত্তি বিক্রি করে দিয়েছেন। তিনি ইউপি সদস্য পদে কয়েকবার নির্বাচন করে পরাজিত হয়েছে । স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে তার সংসার জীবন। সংসারে অভাব-অনাটনের কারণে ঢাকা গার্মেন্টসসহ অনেক ছোট পদে চাকুরি করেছেন তিনি। সর্বশেষ করোনাকালীন সময়ে চাকুরি হারিয়ে বাড়িতে মানবেতর জীবন যাপন করছে। এখন তার জীবনে শুধুই হাহাকার। জানতে চাইলে ফেরদৌস রহমান বলেন, আমার বাড়ি নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলার ১২ নং রামানন্দ খাজুরা ইউনিয়নের হরিণী গ্রামে হলেও আমার জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে নন্দীগ্রামে। ছোটবেলা থেকেই ফুটবল খেলতে আমার খুব ভালো লাগতো। ১৯৮৪ সালে নন্দীগ্রাম পাইলট হাইস্কুল হতে এসএসসি পাশ করার পর আমি আমার বন্ধুদের নিয়ে একটি ফুটবল টিম গঠন করি। যার নাম ছিলো এফএসসি। ওই সময় আমার সাথে খেলেছে সুরেন্দ্রনাথ ও সিরাজুল ইসলামসহ অনেকেই। সেই সোনালী অতিতের কথা মনে হলে চোখে অশ্রুভাসে। নিজের সবকিছু শেষ করে তিলেতিলে গড়ে তুলে ছিলাম ফুটবল টিম। যেখানেই ফেরদৌস টিমের খেলা সেখানেই হাজার হাজার দর্শকের উপস্থিতি ছিলো। আমরা সবচেয়ে বড় জয় পেয়েছি দিনাজপুর জেলার হিলিতে। সেখানে ফাইনাল ম্যাচে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে আমাদের খেলা ছিলো। তাদের টিমে ছিলো অনেক ভালোভালো খেলোয়াড়। সেখানে কয়েকজন জাতীয় দলের খেলোয়াড়ও ছিলো। ওই খেলায় আমরা ৩-১ গোলে জয়লাভ করেছিলাম। তিনি আরো বলেন, স্ত্রী ও ছেলে-মেয়ে নিয়ে সংসার চালাতে পারছিলাম না। তাই ঢাকা গিয়ে গার্মেন্টসে কাজ করতাম। আবার প্রাণ কোম্পানিতে কাজ করেছি। করোনাকালীন সময়ে বেকার বাড়িতে বসে আছি। এখন সংসার কিভাবে চলে তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার ছেলে ছোট একটা দোকান করেছে। এতে যা আয় হয় তা দিয়েই কোনোভাবে দিন চলছে। মেয়েটা নন্দীগ্রাম সরকারি মহিলা ডিগ্রী কলেজে লেখপড়া করছে। খেলোয়াড় ভাতা, সরকারি ও বেসরকারি কোনো সুবিধা পেয়েছেন কি না তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, কখনও কোনো সুবিধা পাইনি। আমি ছেলে-মেয়ের জন্য কিছুই করে দিতে পারলাম না। আর বাঁকী জীবন কিভাবে কাটবে তাও জানি না। এইতো ফুটবলার ফেরদৌস রহমানের জীবন। যা দেখার কেউ নেই বললেই চলে।