গরুর গাড়ির ইতিহাস সুপ্রাচীন

লেখক – মোঃ হায়দার আলী।। কি বিষয়ে লিখব, তা চিন্তা করছিলাম, শেষ পর্যন্ত ঠিক করলাম এবার কি কৃষির প্রাণ কৃষক কী সরকারী খাদ্য গুদামগুলিতে তাদের কষ্ট করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উৎপাদিত  ধান বিক্রি করতে পারছেন, না তৃতীয় প্রভাবশালী অসৎ পক্ষ কৃষক সেঁজে খাদ্য গুদাম গুলি ভর্তি করেছেন। কেন না বাংলার কৃষকেরা  ধান চাষ করে ধান উৎপাদন করতে সার, বীজ, কীটনাশক, নিড়ানী, কৃষি শ্রমিক ইত্যাদিতে যে পরিমান ব্যয় করেন এবং বর্তমানে ধানের বাজার মূল্যেতে কি কৃষক লাভবান হবেন না ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ধান চাষে অগ্রহ হারাবেন সেটা একটি মুখ্য বিষয়। এ সম্পর্কে লিখার জন্য হোন্ডায় করে একজনকে সাথে নিয়ে গোদাগাড়ী – নাচোল রুটের দিকে গেলাম, ধান ক্ষেতের দিকে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ দেখলাম ২ টি গরুর গাড়ি খড় বোঝায় করে নিয়ে যাচ্ছে, তাই কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাওয়া গরুর গাড়ি দৃশ্য দেখে লিখার থিম পরিবর্তন করে গরুর গাড়ি সম্পর্কে লিখার চিন্তা ভাবনা করলাম।
গরুর গাড়ির ইতিহাস সুপ্রাচীন। নব্যপ্রস্তর যুগের সময় থেকেই মানুষ এই যানটি ব্যবহার করে আসছে। ফ্রান্সের ফঁতান অঞ্চলে আল্পস পর্বতের উপত্যকায় একটি গুহায় গরুর গাড়ির যে ছবি পাওয়া যায়, তার থেকে জানতে পারা যায় খ্রিস্টের জন্মের ৩১০০ বছর আগে ব্রোঞ্জ যুগেও গরুর গাড়ির অস্তিত্ব ছিল। হরপ্পা সভ্যতাতেও যে গরুর গাড়ির অস্তিত্ব ছিল তার সপক্ষে প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায়। সেখানেও নানা অঞ্চল থেকে এক অক্ষ বিশিষ্ট চাকাওলা নানা খেলনা পাওয়া গেছে। এগুলি থেকে বিশেষজ্ঞদের অনুমান, খ্রিস্টজন্মের ১৬০০ থেকে ১৫০০ বছর আগেই সিন্ধু অববাহিকা ও ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে গরুর গাড়ির প্রচলন ছিল, যা সেখান থেকে ক্রমে ক্রমে দক্ষিণেও ছড়িয়ে পড়ে।
১৯০৪ সালে অঙ্কিত ওলন্দাজ শিল্পী আডলফ ফান ড্যের ভেনা’র চিত্র রাইখে এরনটে (পাকা ফসল)
সভ্যতার প্রায় উন্মেষকাল থেকেই গরুর গাড়ি এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার প্রায় সর্বত্রই ছিল যাতায়াত ও পরিবহনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ যান। কিন্তু পশ্চিম ইউরোপে পরে দ্রুতগামী ঘোড়ায় টানা গাড়ির ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিবহন ও যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে গরুর গাড়ির ব্যবহার কমে আসে।
পরবর্তীকালে যন্ত্রচালিত লাঙল বা পাওয়ার টিলার এবং নানাবিধ যন্ত্রযানের উদ্ভবের ফলে এখন ঐ অঞ্চলে গরুর গাড়ির ঐতিহ্য কেবলমাত্র টিকে রয়েছে নানারকম লোকসংস্কৃতি ও তাকে ভিত্তি করে নানা মেলা-অনুষ্ঠানে।
আবার আফ্রিকার বহু জায়গায় প্রবল জঙ্গলাকীর্ণ ভূমিরূপের কারণে সেখানে পথঘাট যেকোনও রকম গাড়ি চালনারই অনুপযুক্ত ছিল। তাই এইসব জায়গার মানুষদের মধ্যে গরুর গাড়ি সংক্রান্ত কোনও ধারণার প্রচলনই ছিল না। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকায় যখন ওলন্দাজ ঔপনিবেশিকরা প্রবেশ করতে থাকে, বহুক্ষেত্রেই তারা বাহন হিসেবে গরুর গাড়িকে ব্যবহার করে। ঊনবিংশ শতাব্দীর বিভিন্ন জনপ্রিয় উপন্যাসেও তাই আমরা দক্ষিণ আফ্রিকায় যাতায়াত ও মালবহনের উপায় হিসেবে গরুর গাড়ির উল্লেখ দেখতে পাই। উদাহরণস্বরূপ আমরা এক্ষেত্রে এইচ. রাইডার হ্যাগার্ড’এর বিখ্যাত উপন্যাস কিং সলোমনস মাইনস ‘এর উল্লেখ করতে পারি। এক্ষেত্রে তারা গরুর গাড়ির আরেকটি ব্যবহার জনপ্রিয় করে তোলে। রাত্রিতে বিশ্রাম নেওয়ার সময় বা বিপদে পড়লে তারা প্রায়শই গরুর গাড়িগুলোকে গোল করে সাজিয়ে একধরনের দুর্গ গড়ে তুলে তার মধ্যে আশ্রয় নিত।
গরুর বা ঘোড়ার গাড়িকে ব্যবহার করে এইধরনের দুর্গ গড়ে তোলার রেওয়াজ অবশ্য আমরা এর অনেক আগে থেকেই দেখতে পাই। চেঙ্গিজ খানের নাতি বাতু খানের নেতৃত্বে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপে যে মোঙ্গল আক্রমণ চলে সেখানে তার প্রতিরোধে স্থানীয় অধিবাসীদের দ্বারা গরুর গাড়ির এই ধরনের ব্যবহারের কথা আমরা জানতে পারি। বিশেষ করে কালকার যুদ্ধে কিয়েভ রুশেরা এই ধরনের গাড়িনির্মিত চলমান দুর্গ তৈরি করে মঙ্গোল আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল।
পূর্ব ইউরোপ ও এশিয়ার বহু অংশে গ্রামীণ অঞ্চলে মূলত মাল পরিবহনের কাজে গরুর গাড়ির ব্যবহার এখনও প্রচলিত আছে। এক সময় গ্রামে গরুর গাড়িই ছিল প্রধান বাহন।
গরুর গাড়ি হল দুই চাকাবিশিষ্ট গরু বা বলদে টানা একপ্রকার যান বিশেষ। এই যানে সাধারণত একটি মাত্র অক্ষের সাথে চাকা দুটি যুক্ত থাকে। সামনের দিকে একটি জোয়ালের সাথে দুটি গরু বা বলদ জুতে এই গাড়ি টানা হয়।
সাধারণত চালক বসেন গাড়ির সামনের দিকে। তাঁর পিছনে বসেন যাত্রীরা। বিভিন্ন মালপত্র বহন করা হয় তারও পিছনের দিকে। বিভিন্ন কৃষিজাত দ্রব্য ও ফসল বহনের কাজে গরুর গাড়ির প্রচলন যথেষ্টই ব্যাপক। গ্রাম বাংলায় ঐতিহ্যগতভাবে গরুর গাড়ি কিছুদিন আগে পর্যন্তও যাতায়াত ও মালবহনের কাজে প্রভূত পরিমানে ব্যবহৃত হত। তবে বর্তমানে নানাধরনের মোটরচালিত যানের আধিক্যর কারণে অপেক্ষাকৃত ধীর গতির এই যানটির ব্যবহার অনেক কমে এসেছে।
      এককালে যা কল্পনা করেনি তাই এখন পেয়ে যাচ্ছে হাতের নাগালে। ইট পাথরের মত মানুষও হয়ে পড়ছে যান্ত্রিক। মানুষ তার নিজস্ব ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলছে তারই ধারাবাহিকতায় হারিয়ে যাওয়ার পথে এক সময়ের যোগাযোগের প্রধান অবলম্বন গরুর গাড়ি। পায়ে হাঁটার যুগের অবসান হওয়ার পর মানুষ যখন পশুকে যোগাযোগের মাধ্যমে হিসাবে ব্যবহার করতে শিখলো তখন গরুর গাড়িই হয়ে উঠেছিল সকল পথের যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনের প্রধান মাধ্যম। পণ্য পরিবহনের পাশাপাশি বিবাহের বর-কনে বহনের ক্ষেত্রেও গরুর গাড়ি কোন বিকল্প ছিলনা।
কিন্তু কালের বিবর্তনে এই গরুর গাড়ি আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে। অনুসন্ধানভেদে কিছু কিছু জায়গায় পণ্য পরিবহনের জন্য গরুর গাড়ি ব্যবহার করা হলেও বিবাহের বর-কনের পরিবহনের জন্য গরুর গাড়ির কথা যেন আর চিন্তাই করা যায় না। অনেকের কাছেই একটি যেন অসম্মানজনক হয়ে পড়েছে। এক সময় গ্রামবাংলায় কৃষকের ঘরে ঘরে শোভা পেত নানা ডিজাইনের গরুর গাড়ি। গরুর গাড়িতে টোপর দিয়ে মানুষ এক স্থান থেকে অন্যস্থানে চলাচল করতো। টোপর বিহীন গরুর গাড়ি ব্যবহার হতো মালামাল পরিবহন, ব্যবসা, ফসল ঘরে তোলা বা বাজারজাতকরণের জন্য।
যান্ত্রিক আবিস্কার ও কৃষকদের মাঝে প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগার কারণে গরুর গাড়ির স্থান দখল করে নিয়েছে ভ্যান, অটোরিকশা, নছিমন-করিমন, ভটভটি, বাস, ট্রাক ইত্যাদি।
       ওকি গাড়িয়াল ভাই, হাঁকাও গাড়ী তুই
বিখ্যাত এ গান এখনো কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে শোনা গেলে হৃদয়ে ভেসে উঠে গরু-মহিষের গাড়ী হাঁকিয়ে যাওয়ার দৃশ্য। কিন্তু গান থাকলেও, নেই সেই আগের গরু মহিষের গাড়ী, নেই গাড়িয়াল। নেই হৈ হৈ রৈ রৈ হাঁক ডাক, নেই গাড়ির চাকার ক্যাচ ক্যাচ শব্দ। গরুর হাম্বা অথবা গলা ঝোলানো ঘন্টার টুং টাং আওয়াজ। গরুর গাড়ির পরিবর্তে যান্ত্রিক নছিমন, করিমন, আগলামন, বাস, ট্রাকসহ বিভিন্ন যন্ত্র যানের কারণে আজ জাদুঘরে স্থান হতে চলেছে গরুর গাড়ী। বংশ পরম্পরায় গাড়িয়ালরা জীবন জীবিকার তাগিদে পরিবর্তন করেছে পেশা। এদের কেউ শহরে মজুর খাটছে, আবার কেউবা রিক্সার হেন্ডেল ধরেছে, কেউ অন্যকোন পেশায় নিয়োজিত।
রাজশাহী, রগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর, পাবনা, নওগাঁ, কুষ্টিয়াসহ উত্তরাঞ্চলে  গরু গাড়ির প্রচলন আদিকাল থেকেই। গরুর গাড়িতে বিয়ে, বরযাত্রী, মালামাল পরিবহন, নাইয়রি আনা নেয়া ইত্যাদি এক সময় হতো খুব জাঁকজমকের মধ্য দিয়ে। এছাড়া প্রায় প্রতিটি বাড়ির আঙ্গিনায় শোভা পেতো এই দু’ চাকার গাড়িটি।
এক সময় ওইসব জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে যে কোন গ্রামে অবশ্যই চোখে পড়তো গরু কিংবা মহিষের গাড়ী। সেই দৃশ্য খুব একটা এখন চোখে পড়ে না।
          প্রত্নতাত্বিক গবেষণা গ্রন্থ ও বাংলা বিশ্বকোষ সূত্রে জানা গেছে, ব্রোঞ্জ যুগের পূর্ব গোলার্ধে কুমারের চাকা এবং গাড়ির শঠিন কাষ্ঠ নির্মিত চাকাটির মতো চাকা সর্বপ্রথম মানুষ ব্যবহার শুরু করে।
মিশরীয় ব্যবিলন এবং ভারতের সভ্যতায় চাকাওয়ালা গাড়ি ছিল। এ থেকে ধারণা করা যায় চাকার প্রাথমিক আবিষ্কার ৬ হাজার বছর আগে। ৬ হাজার বছর আগে কাঠ, পাথর, মালপত্র এবং অন্যান্য জিনিসপত্র বয়ে নিয়ে যাওয়া হতো ঢালু পথে গোলাকৃতি কাঠের গুঁড়ির ওপর দিয়ে। এই কাঠের গুঁড়ি থেকে মানুষের মাথায় চাকার ধারণা আসে। একটি বসবার জায়গা তৈরি করে তার দুদিকে দুটো চাকা জুড়ে দিয়ে তৈরি করা হয় গাড়ির প্রচলন।
এক সময় গাড়ি টানার জন্য ব্যবহৃত হতো গরু, মহিষ, ঘোড়া, কুকুর ও মানুষ। এ সময় গরুর গাড়ির চাকায় লৌহ আবরন ছিল না কেবল কাঠ দ্বারা নির্মিত হতো। দ্রারিড় যুগে যখন এ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে তখন থেকে লোহার ব্যবহার চালু হয়। ১৬৪৬ সালে বাই সাইকেলের আবিষ্কার, ১৮২৬ সালে রেল ইঞ্জিন আবিষ্কার, এর পরে মটর গাড়ি বাস, ট্রাক, মটরসাইকেল শ্যালো চালিত যান ইত্যাদি আবিস্কার হলে পুরনো যানবাহনের যায়গা দখল করে নেয়। কিছুদিন আগেও এ অঞ্চলে গরুর গাড়ির ক্যাচ ক্যাচ শব্দে মুখরিত ছিল চার পাশ। গরুর খুড়ার ধুলি গৃহস্থলের হাক ডাক ছিল নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার।
     কালের বিবর্তনে কতো কিছু পাল্টায়—পাল্টায় সংস্কৃতি, সভ্যতা সেই সঙ্গে পাল্টে যায় মানুষের জীবনধারা। এ পরিবর্তনের রেশ ধরেই হারিয়ে যায় সংস্কৃতির সুপরিচিত অনেক পুরনো ঐতিহ্য। এই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের মধ্যে পালকি অন্যতম। গরুরগাড়িতে পালকি সাজিয়ে
‘পালকি চলে, পালকি চলে, গগনতলে আগুন জ্বলে’… তাছাড়া আরো সুন্দর ছন্দবদ্ধ কথা ‘… তুমি যাচ্ছ পালকিতে মা চড়ে …।’ পালকি আমাদের দেশের জাতি, ধর্ম, বর্ণ সবার কাছে সমান পছন্দনীয় ছিলো। এটি আমাদের দেশের হাজার বছরের পুরনো ঐতিহ্য। পালকি নিয়ে লেখা হয়েছে গান, ছড়াসহ কতো শত কবিতা। ছন্দের জাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ অনেক কবি পালকি নিয়ে লিখেছেন।
এক কালে এদেশের জমিদার-নবাবসহ সমাজের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা কোথাও যাতায়াত করলে পালকি ছাড়া চলতোই না যেন। তাদের সামান্য পথটুকু চলতেও পালকি লাগতো। যেমন—তাদের খাসমহল থেকে ঘোড়ার পিঠ পর্যন্ত বা পানসি ঘাট পর্যন্ত যেতেও পালকি ব্যবহার করা হতো। এ তো গেলো এক শ্রেণীর লোকদের কথা। এরা ছাড়াও সমাজের জ্ঞানী-গুণী মানুষদের বরণ করতে তৎকালে পালকির বিকল্প যেন পালকিই ছিলো। সে আমলে বিদেশি কোনো মেহমান এলেও তাকে পালকিতে চড়িয়ে বরণ করা হতো। যেমনটা করা হয় বর্তমান দিনে অতিথিদের সম্মানে মোটর শোভাযাত্রায়। সে যা হোক, পালকির কথা সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন বিশ্ববিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা তার এদেশে আসা ভ্রমণ কাহিনীতে। তার লেখার মধ্যে এ কথাও পাওয়া যায় যে, তিনি পালকি বহনের দৃশ্যে মুগ্ধ হয়েছিলেন।
            তখনকার দিনের বিয়ে এবং পালকি এ যেন ছিলো একই সুতোয় গাঁথা। আমাদের দেশে এমন এক সময় গেছে যখন বিয়ের অনুষ্ঠান পালকি ছাড়া হতোই না, পালকি ছাড়া বিয়ে অনুষ্ঠান সম্পন্ন হলে যেন নিজেদের হতভাগা বলে মনে করা হতো। নতুন বউ তুলে দেয়া হতো বরের বাড়িতে পালকিতে করে। আবার এ বিয়ে উপলক্ষে পালকি সাজানো হতো মনোলোভা ও দৃষ্টিনন্দন সৌন্দর্যে। সব পরিবারে আবার পালকি ছিলো না।
 তখনকার দিনে বিত্তশালী ও উচ্চবংশীয় লোকদের প্রত্যেকের বাড়িতে পালকি ছিল বংশের মর্যাদার প্রতীক। সাধারণ পরিবারের লোকদের বাড়িতে পালকি ছিল না বললেই চলে। তাই বলে তাদের উৎসব পার্বণ পালকি ছাড়া হতো তা কিন্তু নয়। তাদের জন্য অন্য ব্যবস্থা ছিলো। সে সময়ে কিছু কিছু মানুষ এ পালকি নিয়ে বাণিজ্য করতো, মানে পালকি বানিয়ে অর্থের বিনিময়ে চুক্তিতে দিতো। এ জন্য পালকি মালিকদের দিতে হতো মোটা অংকের কড়ি বা টাকা অথবা তার সমতুল্য অন্য কোনো জিনিস।
পালকিকে ঘিরে আরো কিছু লোক জীবন-জীবিকা নির্বাহ করতো। এ লোকদের বলা হতো ‘কাহার’ বা ‘বেহারা’ যেদিন তাদের দরকার হতো  তার আগে ‘বায়না’স্বরূপ মাইনে দিতে হতো। বিয়ের অনুষ্ঠানের দিন বিয়ে বাড়িতে তাদের খাওয়ানো হতো জামাই আদরে। এছাড়া তাদের সম্মানী দিতে হতো বরপক্ষ থেকে।
 মেয়ে বাবার বাড়িতে নাইওর যেতেও ব্যবহার করতো পালকি। পালকিতে চারজন বেহারা বা কাহার প্রয়োজন হতো। গ্রামগঞ্জে অন্যান্য লোকালয়ে পালকিতে করে বউ নেয়া, দৃশ্য চোখে পড়তো। পালকির দরজার ফাঁক দিয়ে নতুন বউটি বাইরে দৃষ্টি দিতো কান্না ভেজা চোখে। যখন বেহারারা বউ নিয়ে যেত গ্রাম থেকে গ্রাম পেছনে ফেলে, তখন তাদের কণ্ঠে চলতো পালকি বহনের গান—‘হুন হুনা হুন হুনরে’ বা ‘চার বেহারার পালকি চড়ে যায় রে কন্যা পরের ঘরে।’ আরো এরকম হৃদয় ছোঁয়া গানে গ্রামগঞ্জ যেন জেগে উঠতো নতুন প্রাণে। তাদের পালকি বহনের সময় পা ফেলার আলাদা তাল বা ছন্দ ছিলো। সেই ছন্দ আর তালের সঙ্গে নিজস্ব গানে গানে কাঁধে নিয়ে বইতো পালকি।
এখন আর গ্রামগঞ্জ, শহর, বন্দরে দেখা যায় না গরুর গাড়িতে সাজানো  পালকি বহনের দৃশ্য। পালকি এখন স্থান পেয়েছে জাদুঘরে প্রদর্শনের জন্য। পালকির সেই ঐতিহ্যময় ব্যবহার ক্রমে গ্রাস করেছে যান্ত্রিক সভ্যতার বিদেশি নানান রংয়ের বাহারি গাড়ি। পালকি বহনের দৃশ্য এখন যেন স্বপ্ন। সেই সঙ্গে হারিয়ে গেছে ছন্দমাখা পালকি বহনের গান।