একজন নারী মুক্তিযোদ্ধা জরিনা’র গল্প !! 

শাফায়াত সজল, বগুড়া প্রতিনিধিঃ বগুড়া জেলার সদর উপজেলার নিশিন্দারা ইউনিয়নের বারপুর স্কুলপাড়ার জনৈক আব্দুল জব্বার এর ঘরে জরিনা বেওয়ার জন্ম। বগুড়া শহরের সাতমাথা থেকে দূরত্ব প্রায় ৫ কিলোমিটার। শহরের উপকন্ঠে গ্রামটি হওয়ায় এখন অনেকটা আধুনিকতার ছোয়া লেগেছে। কিন্তু মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এই গ্রামটি ছিলো আর দশটি গ্রামের মত অনুন্নত, ঝোপঝাড় ও বিভিন্ন জঙ্গলে ভরা। শহর থেকে তখন এই গ্রামে আসার যোগাযোগ ব্যবস্থা তেমন ভাল ছিলোনা।
সেজন্যই মুক্তিযোদ্ধারা এই গ্রামকে নিরাপদ মনে করে তাদের আশ্রয়স্থল হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন। মুক্তিযোদ্ধারা এইখানে বিশ্রাম নেবার জন্য ক্ষনস্থায়ী ঘাটি হিসাবে গড়ে তুলেছিলো। এই বারপুর এলাকা থেকেই তারা যেকোন জায়গায় যুদ্ধে যেত আবার যুদ্ধ শেষে এইখানে ফিরে এসে বিশ্রাম নিতো। অর্থ্যাৎ এইখান থেকেই তারা কোথায় কখন আক্রমণ করবে তার পরিকল্পনা করতো। কিন্তু এই খবরটিও বেশিদিন গোপন থাকেনি। খবরটি চলে যায় পাকবাহিনীর কাছে। কারণ হিসাবে বগুড়া সদরের লাগোয়া কাহালু থানা এলাকার কিছু রাজাকার এই তথ্যটি হানাদার বাহিনীর কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এই তথ্য পাওয়ার পর থেকেই পাকিস্তানিরা নাকি বারপুর এলাকায় মাঝে মাঝেই হামলা করতো।
কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা কৌশলের কারণে তারা বারবার ব্যার্থ  হয়ে ফিরে যেত। এতে পাকিস্তানি বাহিনী আরো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তারপর তারা এই গ্রামের নারীদের টার্গেট করা শুরু করে। শুরু হয় নির্যাতন। মুক্তিযোদ্ধারা এই গ্রামে অবস্থান করছে এমন তথ্যের ভিত্তিতে বিকাল বেলা একদিন হানাদার বাহিনীরা অভিযান চালায়। সেসময় একজন নারীকে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করে তারা। তখন অই নারী ধাক্কা দিয়ে কোনরকমে জীবন নিয়ে পালিয়ে যায়। এতে তারা আরো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। যদি নারীদের না পেতো তাহলে তারা মুরগী গরু ছাগল নিয়ে চলে যেত। এইভাবেই দিনের পরদিন তাদের অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে যেতে থাকলো।
এরপর থেকে যখনই হানাদার বাহিনী আসার খবর পাওয়া যেত তখনই নারীদের পার্শ্ববর্তী গ্রাম শিকারপুর পূর্বপাড়ায় (বাশঁবাড়িয়ায়) পালিয়ে যেত। আর পুরুষরা ঘন ঝোপঝাড় কিংবা ফাকা জমির বাগানে অবস্থান করতো। এইভাবেই ভয়ে ভয়ে যুদ্ধের দিনগুলো পার করতো এলাকাবাসী। একদিন বিপদ এসে দরজায় কড়া নাড়লো। জরিনা বিবি বলেন, আমার বাবা পাশের গ্রাম কৃষ্ণপুর গ্রামের একটি বিড়ি ফ্যাক্টরিতে কাজ করতেন। কার্তিক মাসের শেষ দিকে যখন পাকা ধান কাটা শুরু হয় সেইসময়ের ঘটনা। বাবা প্রতিদিনের মত কাজে চলে যায়। আমরা ৫ ভাই বোনের মধ্য আমি বড়। আমরা ৪ বোন ও ১ ভাই। ছোট বোন আরজিনাকে কোলে নিয়ে আমার মা সহ আমরা কেবলই সকালের ভাত খাইতে বসেছি সেসময় হঠ্যাৎ করেই আকাশে বিমানের বিকট শব্দ শুরু হয়ে গেলো। তার কিছুক্ষণের মধ্য পার্শ্ববর্তী এক চাচা এসে খবর দিলো পাকিস্তানিরা নাকি আমাদের গ্রামের দিকেই আসতেছে।
আমরা সবাই খাওয়া দাওয়া ফেলে দিয়ে উঠে পড়ি। আমার মা ছোটবোনকে কোলে করে নিয়েই ঘরে তালা মারতে যেতে নেয়। তখন আমি তাকে বারণ বলি, “মা তুমি দৌড়ে পালাও, আমিও তালা দিয়ে আসতেছি”। আমার ছোট ভাইবোনদের নিয়ে মা বাড়িতে যাবার পরপরই পাকবাহিনীরা আমাদের বাড়িতে ঢুকে পড়ে। তখন পুরো বাড়িতে আমি একা। তাদের সবার হাতেই ছিলো রাইফেলের মত অস্ত্র। আমি তাদের দেখে ভয়ে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে তাদের মধ্য একজন আমার পায়ে রাইফেল দিয়ে আঘাত করে৷ তখন আমি হোচট খেয়ে মাটিতে পড়ে যাই। এরপর প্রথমেই তাদের একজন আমাকে ধর্ষণ করে। পরে তার দেখাদেখি আরো দুজন। তারপর আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি”। এই নির্মম অত্যাচারের কথা বলতে গিয়ে জরিনার চোখ পানিতে ছলছল করছিলো, কন্ঠে ছিলো দুঃসহ বেদনার ভারাক্রান্ত সুর। তিনি মাত্র ১ বছর আগে পেয়েছেন নারী মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে স্বীকৃতি। তবুও তিনি কোনভাবেই ভুলতে পারেন না পঞ্চাশ বছর আগে ঘটে যাওয়া সেই বিভীষিকাময় দিনের কথা।
জরিনা বিবি তার চাচা বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক নিশিন্দারা ইউপির চেয়ারম্যান হাজী ইজান আলীর পরামর্শে ২০১৯ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারী সরকারের কাছে আবেদন করেন। এবং সকল যাচাই-বাছাই এর পর তার মতো সারাদেশে মোট ৬১ জন বীরাঙ্গনা নারী মুক্তিযোদ্ধাকে স্বীকৃতি দিয়েছে সরকার। ২০২০ সালের ২৭ ডিসেম্বর গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার বগুড়ার জরিনা বিবি সহ ৬১ জন নারী মুক্তিযোদ্ধার নাম গেজেট ভুক্ত করে। প্রথমে তিনি মাসিক ১২ হাজার টাকা পেলেও বর্তমানে ২০২১ সালের জুলাই মাস থেকে ২০ হাজার টাকা করে মাসিক ভাতা পান। তাই দিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যেই চলছে তার সংসার।
তিনি আরো বলেন, স্বাধীনতার পর একই গ্রামের বাসিন্দা শাহাদত হোসেন নামের এক ব্যক্তির সাথে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর কয়েকবছর পার হয়ে গেলেও তার কোন সন্তাননাদি না হওয়ায় তার স্বামী আরেকটি বিবাহ করেন। তখন তার বাবা মৃত আব্দুল জব্বার তাকে শশুরবাড়ি থেকে নিজ বাড়িতে নিয়ে আসেন। কয়েকবছর পর তিনি বারো তার স্বামীর কাছে ফিরে যান ততদিনে তার সতীনের ঘরে সন্তান হয়েছে। এরপর তিনিও সন্তানের মা হোন। তার স্বামী পেশায় একজন নৈশপ্রহরী ছিলো। বাড়ির পাশেই একটি ঢালায় ফ্যাক্টরীতে কম বেতনে তিনি চাকুরী করতেন। বছর দশেক আগে ডাকাতেরা অই কারখানা লুট করার সময় তার স্বামীকে হত্যা করে।
তার স্বামীর নিজস্ব কোন জায়গা জমি না থাকায় তার বাবা তাকে স্থায়ী ভাবে থাকার জন্য দেড় শতক জায়গা দান করেন। বর্তমানে তিনি সেই জায়গাতেই ঘর করে কোনরকমে দুই পুত্র সন্তান, তাদের স্ত্রী ও নাতি-নাতনীদের নিয়ে বসবাস করছেন। জরিনা বিবির বড় ছেলে জিল্লুর রহমান পেশায় একজন স্বর্ণকার এবং ছোট ছেলে জিয়াউর রহমান অটোরিকশার গদি তৈরীর কাজ করছে।  এইভাবেই সুখে শান্তিতে চলছে তাদের সংসার। জরিনা বিবি বলেন, সরকার যে আমাকে সম্মান দিয়েছে এইটাই আমার কাছে অনেক। আমি এখন এই ভাতা দিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে দিনযাপন করছি। আমি সরকারের কাছে কৃতজ্ঞ। তবে আমার ছেলে দুইটার যদি একটা চাকুরী হতো তাহলে আমি মরেও শান্তি পেতাম। আমাদের জায়গা কম কিন্তু জনসংখ্যা বেশি। সরকার যদি আমাদের বাড়ি করার জন্য কোম জায়গা দিতো তাহলে আরো ভাল হতো। আশাকরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমার দিকে সুনজর দিবেন।