সৌদি আরবে তাবলিগ জামাত নিষিদ্ধ: মিশ্র প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশসহ বিশ্বের ইসলামিক স্কলারদের

অনলাইন ডেস্ক: সম্প্রতি তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে সতর্কতা জারি করেছে সৌদি আরব। এরই ধারাবাহিকতায় জুমার নামাজের খুতবায় এ সংগঠন সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করার নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির ইসলাম বিষয়ক মন্ত্রী ডা. আব্দুল লতিফ আল শেখ। গত ৬ ডিসেম্বর সোমবার এক টুইট বার্তায় এ নির্দেশনা জানানো হয়। সৌদি আরবের মতো একটি ইসলামিক রাষ্ট্রের এমন নির্দেশনায় হঠাৎ যেন স্তম্ভিত হয়ে পরেছে বিশে^র ইসলামিক স্কলাররা এবং ইসলাম প্রচারের সাথে সংশ্লিস্ট বিভিন্ন সংগঠনগুলো যারা নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে সৌদি আরব প্রশাসনকে এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে পুন:বিবেচনারও আহ্বান জানাচ্ছেন বারংবার।
এক টুইট বার্তায় সৌদির ইসলামিক অ্যাফেয়ার্স দফতরের মন্ত্রী এ সংগঠনকে সন্ত্রাসে জড়িত হওয়ার অন্যতম ‘মাধ্যম’ উল্লেখ করে এর বিপথগামীতা, বিচ্যুতি ও ভয়াবহতার নানা দিক মুসল্লিদের কাছে তুলে ধরতে আহ্বান জানান। এছাড়াও সংগঠনটির প্রধান ভুলগুলো মানুষের সামনে তুলে ধরার নির্দেশ দেওয়া হয়। আরও বলা হয়, এটি সন্ত্রাসবাদের একটি প্রবেশপথ। এদের বিপদ সম্পর্কে মানুষকে বোঝান। হঠাৎ করেই ইসলাম ধর্মানুসারীদের কাছে অত্যন্ত আবেগের রাষ্ট্র (পবিত্র মক্কা ও মদিনার জন্যে) সৌদি আরবের এমন নির্দেশনায় এশিয়া মহাদেশসহ বিশে^র ইসলামিক স্কলাররা মর্মাহত হয়ে একাধিক বিবৃতি দিয়েছেন এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে। তাদের ভাষ্য এত বড় একটি সিদ্ধান্তের আগে উপমহাদেশের ইসলামিক আলেমদের সাথে বৈঠক হতে পারতো। তারা জানান, বিশ্বব্যাপী কার্যক্রম ছড়িয়ে থাকা এই সংগঠনটি প্রায় ১০০ বছর আগে ভারতের মেওয়াতে মোহাম্মদ ইলিয়াস কান্দলাবির হাত ধরে বিশুদ্ধ ইসলাম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করে। সাধারণ মুসলিমদের মধ্যে ইসলামের নির্দেশনা পালনে উৎসাহ দেওয়াই মসজিদ ভিত্তিক এ সংগঠনের প্রধান ও মৌলিক কাজ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বস্তুত, এখনো গ্রামে গ্রামে ঘুরে সে কাজই করে তাবলিগ। কীভাবে আদর্শ মুসলিম হয়ে উঠতে হবে, তার পাঠ দেওয়া হয় এই সংগঠনটির মাধ্যমে। এখানে উল্লেখ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তাবলিগের প্রভাবও উল্লেখযোগ্য। ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ায় তাবলিগের শক্তিশালী সংগঠন আছে। সারা বিশ্বে ৩৫০-৪০০ মিলিয়ন অনুসারী রয়েছে বলে দাবি সংগঠনের। বলা হয় সংগঠনটির লক্ষ্যই হলো ধর্মীয় বিষয়ের উপর জোর দেওয়া এবং অত্যন্ত কড়াভাবে রাজনীতি এড়িয়ে চলা। বিশ্বের নানা দেশে এর কার্যক্রম নিয়ে অভিযোগ তোলা হলেও তা আজও প্রমাণিত হয়নি। তাবলীগ জামাতীরা মধ্যপন্থী ইসলামকে অনুসরণ করে এবং জেহাদের নামে সন্ত্রাসবাদে কোনভাবেই বিশ^াস করেনা। তাই সৌদি সরকারের এ সিদ্ধান্তে নিন্দা জানিয়েছেন বিভিন্ন দেশের ইসলামিক স্কলাররা।
এ প্রসঙ্গে বিভিন্ন মিডিয়ায় সাংবাদিক এবং ইসলাম বিষয়ক গবেষক জাভেদ আখতার বলেন, সৌদি আরবের সদ্য নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসা তাবলিগ জামাত ও দাওয়া দুটিই সুন্নি মুসলিমদের সংগঠন। অন্যদিকে সৌদি আরবের অধিকাংশ মানুষ আহলে হাদিস মতাদর্শের অনুসারী। পূর্ব থেকেই দুই শিবিরের মধ্যে একটি সংঘাত রয়েছে। জাভেদের মতে, ”ওয়াহাবিদের সঙ্গে তাবলিগের বরাবরই বিরোধ ছিল। সৌদিতে ওয়াহাবিদের গুরুত্ব বেশি। তাদেরই চাপে সরকার তাবলিগকে নিষিদ্ধ করেছে।” কিন্তু ভারতে তাবলিগ নিয়ে যখন বিতর্ক হয়েছিল তখন ওয়াহাবিরা তাবলিগের পাশে দাঁড়িয়েছিল।
এদিকে আবার অনেকের মতে তাবলিগ শুদ্ধ ইসলাম চর্চার পথ দেখালেও উল্টো সৌদির ওয়াহাবি মতাদর্শীরাই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জেহাদী সন্ত্রাসবাদের দিকে পরিচালিত করে।
অল ইন্ডিয়া মুসলিম মজলিস মোশাওয়ারাতের প্রধান নাভেদ হামিদ উক্ত ঘটনার পর বলেছেন, ”সৌদির বিবৃতিটি এখনো খুব স্পষ্ট নয়। তারা তাবলিগের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করছে, নাকি স্থানীয় স্তরে কিছু ব্যবস্থা নিচ্ছে, এ বিষয়টি স্পষ্ট হচ্ছে না। যার থেকে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।” নাভেদের বক্তব্য, ওয়াহাবিদের সঙ্গে তাবলিগের ইসলামিক ভাবনার তফাত আছে। কিন্তু তাই বলে একটি সংগঠনকে নিষিদ্ধ করা হবে কেন, তা বোঝা যাচ্ছে না।
তাবলিগ কে নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই লেখা জিয়া উস সালাম সৌদির উক্ত সিদ্ধান্তের পর মন্তব্য করেন যে ”নিষিদ্ধ ঘোষণা করার মতো কোনো কাজ তাবলিগ করে না। তাদের সঙ্গে সন্ত্রাসের যোগ তৈরি করা অনুচিত। সৌদির মতো রাষ্ট্র এ কাজ করলে অবাক লাগে।” আবার এদিকে লক্ষ্য করার মতো বিষয় হচ্ছে তাবলীগ জামাত কোনো ধরনের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ছাড়াই নিজেদের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশে দলমত নির্বিশেষে গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। এর প্রতিফলন মসজিদে দেখা যায়। দেশের বিভিন্ন জায়গায় তাদেরকে নানা ধরনের সহযোগিতাও করে থাকেন সাধারণ মানুষ। সেই হিসাবে তাবলীগ জামাত এখানে খুবই জনপ্রিয়। যদিও একাধিক গ্রুপের রেষারেষিতে সেই জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা অনেকটা কমলেও সৌদির নিষেধাজ্ঞার কোন প্রভাব এই অঞ্চলে পরবে না মর্মে এমন শঙ্কাকে উড়িয়ে দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সৌদির এমন সিদ্ধান্তের পরপরই হেফাজতে ইসলামসহ দেওবন্দ পন্থী কওমি আলেমরা সৌদি সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন। এমনকি হেফাজতে ইসলামসহ কওমিপন্থী নানা ব্যক্তি ও সংগঠন এ বিষয়ে বিবৃতিও দিয়েছেন।
সম্প্রতি এক বিবৃতিতে বাংলাদেশের আলেম মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভি বলেন, সৌদি সরকার শতবর্ষী একটি দিনি আন্দোলনকে এভাবে একতরফা নিন্দা ও নিরুৎসাহিত করতে পারেন না। এ বিষয়ে মাওলানা মুহাম্মাদ রাবে হাসানি নদভি, মাওলানা সাইয়েদ আরশাদ মাদানি, মাওলানা মুফতি তাকি উসমানিসহ বিশ্বের সেরা আলেমদের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে।