গোদাগাড়ীতে পদ্মার বুকে হচ্ছে পিঁয়াজ, ভুট্টা ও ধানের চাষ

রাজশাহী থেকে মো. হায়দার আলী : নদীর দেশ বাংলাদেশে বর্তমানে নদীর বেহালদশা। শত শত নদী মরে যাচ্ছে, অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাচ্ছে। দেশে জলবায়ুর প্রতিকূল প্রভাব পড়ছে। এখন শুধু ইতিহাসের পাতায় লেখা একটি নদীর নাম পদ্মা।
এটা কি নদী? বিশ্বাস করা যায় না। পদ্মার সেই খরস্রোত নেই কেন? এমন সব প্রশ্নের জবাব দিতে হচ্ছে একালের শিশু, কিশোর, ছাত্রছাত্রীসহ কোন আগন্তুককে।
বিশাল বিস্তৃত্ব ধু-ধু বালুচর আর পানির ক্ষীণ বিল কিংবা লেকের মতো পদ্মার ঐতিহ্য অস্তিত্বকে এতটা বিপন্ন করেছে। নদী আছে পানি নেই, বালু আছে কিন্তু কোথায় যেন কোন মাটির খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না, ফলে পদ্মার কোলে জেগে উঠা চরে সবুজ ফসল ফলানো সম্ভাব হচ্ছে না। তবে পদ্মা নদীতে গোদাগাড়ীর   পিঁয়াজ, সবজি, মুসরি, ধনিয়া চাষ করেছেন করেছেন এলাকার কৃষকগণ। এ যেন পদ্মার বুকে জেগে ওঠা সবুজের সমাহার, খুব সুন্দর লাগছে, দেখে মন প্রাণ জুড়িয়ে যাচ্ছে।
অপর দিকে  প্রতি বছর বালু জমতে জমতে নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে। পদ্মার ভয়াবহ রূপ দিন দিন হারিয়ে ফেলেছে। বিগত বছরগুলোতে এ নদীর ক্ষীণ স্রোতধারা থাকলেও এবার তাও নেই। একটা বিলে পরিণত হয়েছে। আর কিছু দিন পর (শুষ্ক মৌসুুুমে) নৌকার পরিবর্তে গরুর গাড়ি কিংবা সাইকেলে নদী পার হতে হবে সচেতন মহলের ধারণা।
ফারাক্কা ব্যারেজের সব কয়টি গেট বন্ধ করে নদী শাসন করে মেরে ফেলা হয়েছে পদ্মাসহ অসংখ্য নদনদীকে। জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে পরিবেশ জীবন-জীবিকায় নেমে এসেছে ধস। দেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা ধীরে ধীরে মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে। গ্রীষ্ম মৌসুমে পানির স্তর আস্বাভাবিকভাবে নিচে নেমে যাওযায় উত্তরাঞ্চলের বেশিরভাগ নলকূপে পানি উঠা বন্ধ হয়ে যায়। দেখা দেয় তীব্র পানির সংকট। উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের জীবনে অভিশাপ বয়ে এনেছে এই ফারাক্কা ব্যারেজ। এসব এলাকার মানুষ যাকে মরণ ফাঁদ বলে জানে। এ ব্যারেজ চালু হওয়ার সময় বলা হয়েছিল এটি উভয় রাষ্ট্রের কল্যাণের প্রতীক। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের বিমাতাসুলভ আচারণের কারণে এ ব্যারেজ এ দেশের মানুষের জন্য অকল্যাণ।
 একতরফা পানি প্রত্যাহার করে ভারত তাদের বন্দর, কৃষি, সেচ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা সচল রাখলেও এদেশের কৃষি, নৌযোগাযোগ, পরিবেশ, জীবন-জীবিকাকে ঠেলে দিয়েছে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে। বিভিন্ন সময়ে পদ্মার পানি বণ্টন নিয়ে অনেক আলোচনা-মাপজোক আর পর্যবেক্ষণ হয়েছে। চুক্তি হয়েছে, চুক্তি নিয়ে সংসদে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হেয়েছে কিন্তু বাংলাদেশের ভাগ্যে কখনই চুক্তি মোতাবেক পানি জুটেনি। তবে পানি এসেছে সংসদে, টেলিভিশন, রেডিও, টেলিফোনে। এর ফলে শুধু পদ্মা নয় অভিন্ন ৫৪টি নদনদীর পানি ভারত একতরফা প্রত্যাহার করে চলেছে। ফলে এপারের নদনদীগুলো মরে যাচ্ছে। পদ্মা নদী মরে যাওয়ার সাথে সাথে শাখা নদী বড়াল, মরাবড়াল, নারোদ, মুছাখান, ইছামতি, চিকনাই, নাগর, ধলাই, গড়াই, মাথাভাঙ্গা, হিসলা, কাজলা, চিত্রা, সাগোরখালি, চন্দনা, কপোতাক্ষ মরে যাচ্ছে, কালিগঙ্গা, বেলাবত এসব নদীর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে।
বর্ষা মৌসুমে কিছু দিনের জন্য এসব নদীতে পানি থাকলেও প্রায় সারা বছর থাকে পানিশূন্য। তাছাড়া এসব নদী মরে যাওয়ার সাথে সাথে দুপাশ অবৈধভাবে দখল হয়ে গেছে। এখন এসব নদীর নাম বইয়ের পাতায় কিংবা মানচিত্রে স্থান পেয়েছে।
 বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশর কোটি কোটি মানুষ বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাসের কবলে পতিত হয়, সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয় এতে তাদের দুঃখের সীমা থাকে না। অকালে ঝরে যায় লাখ লাখ মানুষ, গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগীর প্রাণ। জলবায়ুর ওপর দেখা দেয় বিরূপ প্রভাব। এর অন্যতম প্রধান কারণ মরণ বাঁধ ফারাক্কা। শুষ্ক মৌসুমে দুই দেশের মধ্যে পানি বণ্টনের নিমিক্তে অনেক আলোচনা হয়েছে কিন্তু সে অনুযায়ী বাংলাদেশ কখনই তার অংশ পায়নি এবং পাওয়ার কথাও নয়। ফারাক্কা ব্যারেজকে উজানে পরিমিত পানি প্রত্যাহারের প্রকল্প ভাবলে সম্পূর্ণ ভুল করা হবে। কলকাতা বন্দরকে সচল রাখতে এবং হুগলী নদীর নাব্যতা বাড়াতে ব্যারেজটি করা হয়েছে নেহায়েত খোড়া যুক্তি। মওলানা আবদুল হামিদ খাঁন ভাসানী ফারাক্ক ব্যারেজের বিরুদ্ধে ব্যারেজমুখী ফারাক্কা লংমার্চ করেছিলেন- ব্যারেজটির মারাত্মক পরিণিতির কথা বিবেচনা করে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে সংসদে গিয়ে, দেশের স্বার্থে একযোগে কাজ করা দরকার।

সর্বশেষ সংবাদ