বালাসী-বাহাদুরাবাদঘাট নাব্য সংকটে নৌরুটে ‘ফেরির বিকল্প’ লঞ্চ চলাচলও বন্ধ

আরিফ উদ্দিন, গাইবান্ধা প্রতিনিধিঃ গাইবান্ধায় পরীক্ষামূলকভাবে বালাসী-বাহাদুরাবাদঘাট নৌরুটে ‘ফেরির বিকল্প’ হিসেবে লঞ্চ সার্ভিস চালুর প্রায় দু’মাসের মাথায় দেড় শতাধিক যাত্রী নিয়ে নাব্য সঙ্কটে ডুবোচরে আটকে গেছে এমভি মোহাব্বত ও রিভারস্টার নামে দু’টি লঞ্চ।
শনিবার (৭ মে) সকালে ফুলছড়ি উপজেলার বালাসীঘাট থেকে আধাকিলোমিটার দুরে ব্রহ্মপুত্র নদে এমভি মোহাব্বত নামে একটি লঞ্চ ডুবোচরে আটকে যায়। পরে নৌকা ও স্পীডবোটে করে লঞ্চে আটকে পড়া যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দেয়া হয়। এর আগে শুক্রবার (৬ মে) সন্ধ্যায় রিভারস্টার নামে আরেকটি লঞ্চ ডুবোচরে আটকে যায়। বর্তমানে এই রুটে লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে।
লঞ্চ মালিক সমিতির সভাপতি মেহেদী হাসান জানান, নাব্য সংকটের কারনে প্রায়ই এই রুটে ডুবোচরে লঞ্চ আটকে যায়। এবার এমনভাবে লঞ্চ দুটি ডুবোচরে আটকে গেছে ড্রেজিং ছাড়া কোনভাবেই ছাড়ানো সম্ভব নয়। এ অবস্থায় যাত্রীরা পড়েছেন ভোগান্তিতে। নিয়মিত ড্রেজিং ব্যবস্থা চালু থাকলে তবেই এই রুটে লঞ্চ চলাচল সম্ভব।
আশরাফুল আলম নামে লঞ্চের এক যাত্রী জানান, যানজট থেকে বাঁচতে ও সময় কম লাগার জন্য বালাসী-বাহাদুরাবাদঘাট রুট হয়ে ঢাকা যাচ্ছিলাম। কিন্তু কিছুদুর যেতেই লঞ্চটি ডুবোচরে আটকে যায়। যানজট থেকে বাঁচতে যদি এমন বিড়ম্বনার শিকার হতে হয় তাহলেতো লঞ্চ সার্ভিসের দরকার নেই।
মঞ্জু মিয়া নামে আরেক যাত্রী জানান, শুনেছি এই রুট খননের জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। কি খনন হয়েছে বোঝাই যাচ্ছে। যেখানে লঞ্চ চলাচল করতে পারে না ফেরী তো সেখানে স্বপ্নের মত। শুধু শুধু সরকারের টাকাগুলো নষ্ট করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত: যমুনা নদীর বঙ্গবন্ধু সেতুর বিকল্প পথ তৈরি করা হবে-এমন যুক্তি দেখিয়ে ২০১৭ সালে গাইবান্ধার বালাসী থেকে জামালপুরের বাহাদুরাবাদ পর্যন্ত ফেরি রুট খনন এবং ঘাটের অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের কাজ শুরু করে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। দুই দফায় সংশোধনের মাধ্যমে টাকার অঙ্ক ও মেয়াদ বাড়িয়ে গত জুনে ১৪৫ কোটি টাকার এ প্রকল্প শেষ হয়। এমন সময়ে বালাসী-বাহাদুরাবাদ রুটটি ফেরি চলাচলের উপযোগী নয় বলে প্রতিবেদন দেয় বিআইডব্লিউটিএ গঠিত একটি কারিগরি কমিটি। এছাড়া দুই দফায় ট্রায়াল রান করতে গিয়ে নাব্য সংকটে দুবারই আটকে যায় বিআইডব্লিউটিসির খালি ফেরি। এ কারণে বারবার উদ্যোগ নিয়েও এ রুটে ফেরি চালু করতে পারেনি নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়।
অবশেষে গাইবান্ধার বালাসীঘাট থেকে জামালপুরের বাহাদুরাবাদ পর্যন্ত নৌপথে পরীক্ষামূলক লঞ্চ চলাচল চালু করা হয়। গত ০৯ এপ্রিল (শনিবার) দুপুরে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী লঞ্চ চলাচল কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। প্রতিমন্ত্রী প্রথমে বাহাদুরাবাদ টার্মিনাল ভবনের উদ্বোধন করেন। পরে তিনি টার্মিনালের পশ্চিম পাশে বাহাদুরাবাদ লঞ্চঘাটে লঞ্চ চলাচল কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। এরপর তিনি নৌপথে গাইবান্ধায় আসেন। সেখানে লঞ্চ চলাচল কার্যক্রম এবং বালাসী ফেরিঘাট টার্মিনাল উদ্বোধন শেষে তিনি সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে এবং বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদের তথ্যসূত্রে জানা গেছে, ১২৪ কোটি টাকা খরচ থেকে দুই দফায় বেড়ে ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে গাইবান্ধার ফুলছড়ির বালাসী এবং জামালপুরের বাহাদুরাবাদ ফেরিঘাট টার্মিনালে দৃষ্টিনন্দন বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। বিশাল দুটি প্রবেশদ্বারের সঙ্গে ভেতরে বাস টার্মিনাল, টোল আদায় বুথ, পুলিশ ব্যারাক, আনসার ব্যারাক, ফায়ার সার্ভিস স্টেশন, ফেরির নাবিকদের ব্যারাক, বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন, জেনারেটর সাবস্টেশন, বিশ্রামাগার, মসজিদ, রেস্তোরাঁ, শৌচাগার ও অভ্যন্তরীণ রাস্তা করা হয়েছে। কিন্তু নাব্যতা সংকটের কারণে এসব স্থাপনা নির্মাণ সম্পন্ন হলেও ফেরি সার্ভিস চালু করা সম্ভব হয়নি। এখন পরীক্ষামূলকভাবে লঞ্চ সার্ভিস চালু করা হলো। তবে স্থানীয় লোকজনের দাবি, কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে শুধু লঞ্চ সার্ভিস চালু করায় স্থানীয় মানুষ এবং যাত্রীরা খুব বেশি উপকৃত হবে না।
জানা যায়, ব্রিটিশ সরকার ১৯৩৮ সালে তিস্তামুখ ঘাট-বাহাদুরাবাদ নৌরুট চালু করে। এপারে গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার তিস্তামুখ ঘাট ওপারে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার বাহাদুরাবাদ ঘাট। তখন থেকে এই রুটের মাধ্যমে ঢাকা-দিনাজপুর রেল যোগাযোগ চালু ছিল। উত্তরাঞ্চলের আটটি জেলার মানুষ ট্রেনে করে তিস্তামুখ ঘাটে যেতেন। এরপর তিস্তামুখ ঘাট-বাহাদুরাবাদ রুটে ফেরি পারাপার হতেন। ওপারে বাহাদুরাবাদে গিয়ে ট্রেনে উঠে ঢাকায় যেতেন। সে সময় কম খরচে নিরাপদে ঢাকা যাতায়াত করা যেত।
১৯৯০ সালে নদীর নাব্যতা–সংকটের কারণে তিস্তামুখ ঘাটটি একই উপজেলার বালাসীতে স্থানান্তর করা হয়। এ জন্য প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে ত্রিমোহিনী থেকে বালাসী পর্যন্ত নতুন প্রায় ছয় কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করা হয়। তখন বালাসী-বাহাদুরাবাদ রুটের মাধ্যমে একইভাবে রেল যোগাযোগব্যবস্থা চালু ছিল। তৎকালীন বালাসীঘাটে রেলওয়ের নানা ধরনের ৩০টি নৌযান ছিল। ২০১৫ সালের পর থেকে এসব নৌযান বিক্রি শুরু হয়।
১৯৯৬ সাল থেকে যমুনা নদীতে নাব্যতা হ্রাসের কারণে বালাসী-বাহাদুরাবাদ রুটে ফেরি চলাচল বন্ধের উপক্রম হয়। ১৯৯৮ সালের জুন মাসে যমুনা বহুমুখী সেতু চালু হয়। ফলে ২০০০ সাল থেকে এই রুটে ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। অকার্যকর হয়ে পড়ে বালাসীঘাট। তখন থেকে প্রায় ২২ বছর বালাসী-বাহাদুরাবাদ রুটে ফেরি চলাচল বন্ধ আছে। তবে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে পারাপার অব্যাহত আছে।
২০১৬ সালে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের প্রধানের নেতৃত্বে নৌ, সড়ক, স্থানীয় সরকার, পানি উন্নয়ন বোর্ড, রেল ও বিআইডব্লিউটিএর প্রতিনিধিরা এলাকাটি পরিদর্শন করেন। পরে পরিকল্পনা কমিশনে প্রতিবেদন দেওয়া হয়। ২০১৭ সালের ২৪ অক্টোবর ১৩৬ কোটি টাকার ঘাট চালুর প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) পাস হয়।
গাইবান্ধার বালাসী ও জামালপুরের বাহাদুরাবাদের ২৬ কিলোমিটার নৌপথ। এ রুটে গত বছরের জুন থেকে পুরোদমে ফেরি চলাচল শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তখন প্রকল্পের কাজ শেষ পর্যায়ে আসায় ওই পথ দিয়ে কয়েক দফায় পরীক্ষামূলকভাবে ফেরি চালানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ফেরি চালানো সম্ভব হয়নি। এরপর গত বছরের এপ্রিলে নৌরুটটির সমস্যা খুঁজে দেখতে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) একটি কমিটি করে। কমিটি তাদের প্রতিবেদনে জানায়, যমুনা নদী খুবই পরিবর্তনশীল এবং ঘন ঘন রুট পরিবর্তন করায় নৌপথ সংরক্ষণ করতে বছরে ৩২ থেকে ৩৩ লাখ ঘনমিটার ড্রেজিং করতে হবে। ফেরি চালাতে হলে এ রুটে সার্বক্ষণিক ছয় থেকে সাতটি ড্রেজার রাখতে হবে। বছরে ব্যয় হবে ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা।
তখন আরও জানানো হয়েছিল, রুটটি ফেরি চলাচলের উপযোগী নয়। পরে এই রুটে স্পিডবোট ও লঞ্চে যাত্রী পারাপারের বিষয়টি আলোচনায় আসে। ওই ভাবনা থেকেই অবশেষে এই রুটে লঞ্চ সার্ভিস চালু করা হয়।

 

সর্বশেষ সংবাদ