শীতের আগমনের শুরুতে রস সংগ্রহে ব্যস্ত গাছিরা

শাফায়াত সজল, কাহালু থেকে ফিরেঃ ঋতু শরৎকে বিদায় দিয়ে হেমন্তকে বরণ করেছে প্রকৃতি। বৈচিত্রপূর্ণ ছয়টি ঋতুর দেশ আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। এক একটি ঋতুর রয়েছে এক একটি বৈশিষ্ট্য। ঋতু বৈচিত্রে এখন রাতের শেষে কুয়াশা ও হাল্কা ঠান্ডা জানান দিচ্ছে শীতের আগমনী বার্তা। আবহমান গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য খেজুর রস সংগ্রহে বগুড়া জেলার কাহালু উপজেলার কয়েকটি গ্রামের রাস্তায় খেজুর রস সংগ্রহের জন্য গাছিরা খেজুর গাছ কেটে রস সংগ্রহের কাজে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন। অপরুপ সৌন্দর্যে সকলের মন মাতিয়ে তুলছে মিষ্টি খেজুর রসের ঘ্রাণ। কাক ডাকা ভোরে রস সংগ্রহ এবং সন্ধ্যায় চলছে গাছ পরিচর্যার কার্যক্রম। এবার কিছুটা আগেই বিভিন্ন উপজেলায় প্রান্তিক জনপদের গ্রামে গ্রামে সকালের শিশিরের সাথে অনুভুত হচ্ছে মৃদু শীত। ব্যাপকভাবে না হলেও আর মাত্র কয়েক দিন পর রস সংগ্রহ করে তা থেকে লালি ও গুড় তৈরির পর্ব শুরু হয়ে চলবে প্রায় মাঘ মাস পর্যন্ত। খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহের দৃশ্য এখন আর তেমন চোখে পড়ে না। যারাও করছে তাদের হয় লোকসান।
খেজুর রস ও গুড়ের জন্য উত্তরাঞ্চলের জেলার গুলোর একসময় খ্যাতি ছিল। সময়ের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রাম বাংলার প্রাচীনতম ঐতিহ্যবাহী খেজুরের গুড়। বছর দশেক আগেও বিভিন্ন এলাকার অধিকাংশ বাড়িতে, ক্ষেতের আইলে, ঝোপঝাড়ের পাশে ও রাস্তার দুই ধার দিয়ে ছিল অসংখ্য খেজুর গাছ। কোন পরিচর্যা ছাড়াই অনেকটা প্রাকৃৃতিক ভাবে বেড়ে উঠতো খেজুর গাছ। যাদের জমির উপরে খেজুর গাছ ছিলো তারা রস দিয়ে পরিবারের খাদ্যঘাটতি পূরণ করতো। সাধারণ মানুষের সচেতনতার অভাবে পুকুরের পাড়ে কিংবা রাস্তার ধারে পরিবেশ বান্ধব খেজুর গাছ এখন আর তেমন চোখে পড়ে না। ইট ভাটার রাহু গ্রাসে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার বেশি হওয়ার কারণে অল্প যে পরিমাণ গাছ চোখে পড়ে তাও নির্বিচারে নিধন করায় দিনদিন খেজুর গাছের পরিমাণ কমছেই। এখনও শীতকালে শহর থেকে মানুষ দলে দলে ছুটে আসে গ্রাম বাংলার খেজুর রস খেতে। রস আহরণকারীদের প্রাণচাঞ্চল্য লক্ষ্য করা যেত সে সময়ে। অনেকে আবার বাড়িতেই রস জ্বালিয়ে পাতলা লালী, দানা গুড় ও পাটালী তৈরি করতেন। যার সাধ ও ঘ্রাণ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এখন অবশ্যই একথা নতুন প্রজন্মের কাছে রূপকথার গল্প মনে হলেও তা ছিলো বাস্তব। যত বেশি শীত পড়বে তত বেশি মিষ্টি রস দেবে খেজুর গাছ। এই গাছ ৮ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত রস দেয়। এটাই তার বৈশিষ্ট্য। শীতের পুরো মৌসুমে চলে রস, গুড়, পিঠা, পুলি ও পায়েস খাওয়ার পালা। খেজুরের পাতা দিয়ে আর্কষনীয় পাটি তৈরী হয়। শুকনো ডালপালা জ্বালানি কাজেও ব্যবহার করা হয় । কিন্তু জয়বায়ু পরিবর্তন, কালের বির্বতনসহ বন বিভাগের নজরদারী না থাকায় বাংলার ঐতিহ্যবাহী খেজুর গাছ এখন জেলা জুড়েই বিলুপ্তির পথে। বগুড়া সদর উপজেলা থেকে রস সংগ্রহে আসা গাছি আবুল কালাম জানান “আমরা পেশাগত কারণে প্রায় প্রতি বছরেই বগুড়ার বিভিন্ন উপজেলার যেমন তারাতগাড়ী, আশোকোলা, উচলবাড়িয়া, নামুজা, বিবিরপুকুর, বগা, মাঝিহট্ট ও নলডুবি এলাকার খেজুর গাছ মালিক এর কাছ থেকে ৪ মাসের জন্য গাছ ভেদে ৫ থেকে ৭ কেজি করে খেজুরের গুড় দেওয়ার চুক্তিতে গাছ গুলো আমরা নেই। চাহিদা মত খেজুর গাছ না পাওয়ার কারণে রস কম হওয়ায় আশানুরুপ রস বিক্রি করতে পারি না। তবু এই বছর প্রায় ১শ খেজুর গাছের মালিকদের সাথে চুক্তি করেছি। তবে যে ভাবে খেজুর গাছ কাটা হচ্ছে অল্প দিনের মধ্যেই আমাদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে”।
বর্তমান বাজারে আখের গুড় যে মূল্যে বেচাকেনা হচ্ছে তার চেয়ে মানসম্পন্ন খেজুরের গুড়ের দাম এই বছর কিছুটা বেশি হতে পারে। শীত একটু বেশি পড়তে শুরু করলে আত্মীয় স্বজনদের দাওয়াত এবং পিঠা-পুলির উৎসবে খেজুর গুড়ের দাম আর চাহিদা বৃদ্ধি পায়। সে সময় তাদের লাভ একটু বেশি হয়। তাছাড়া যে পরিমাণ শ্রম দিতে হয় সে পরিমাণে তারা লাভ করতে পারে না। এব্যাপারে জাহেদুর রহমান ডিগ্রি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক ও কবি আখতারুল আলম বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলেই খেজুর গাছ প্রায় বিলুপ্তির পথে। গাছিদের খেজুর গাছ কাটার কাজটি শিল্প আর দক্ষতায় ভরা। ডাল কেটে গাছের শুভ্র বুক বের করার মধ্যে রয়েছে কৌশল, রয়েছে ধৈর্য ও অপেক্ষার পালা। খেজুর গাছ আমাদের অর্থনীতি, সংস্কৃতি, সাহিত্য তথা জীবনধারায় মিশে আছে। এই ঐতিহ্যকে যে কোন মূল্যে আমাদের রক্ষা করতে হবে”। বগুড়া জেলা প্রশিক্ষন অফিসার মোছাঃ রাহেলা পারভীন বলেন,”আমাদের জেলা কৃষি অফিস থেকে উপজেলা পর্যায়ের সকল কৃষি কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যে, তালগাছের পাশাপাশি রাস্তার ধারে খেজুর গাছ লাগানোর জন্য কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে। এতে করে একদিকে আমাদের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা হবে। অপরদিকে শীত মৌসুমে খেজুরের রস ও গুড়ের মাধ্যমে খাদ্য চাহিদা পুরণ হবে”।