প্রসঙ্গ: পাহাড় ধস রোধ ও পূনর্বাসন প্রক্রিয়া

স্মরণকালের ভয়াবহ পাহাড়ধ্বসের ঘটনাটি ঘটেছিল ২০০৭ সালের ১১ জুন। এতে প্রায় ১২৭ জনের প্রাণহাণির ঘটনা ঘটে। তখন টনক নড়েছিল চট্টগ্রাম প্রশাসনের। এ ঘটনার পর সরকার হাতে নিয়েছিল বেশ কিছু পরিকল্পনা। কিন্তু পরবর্তী তার কোনটার বাস্তবায়ন আর হয়ে উঠে না। এর পরও আমরা দেখে আসছি ২০০৮, ২০১০, ২০১১ এবং ২০১২ সালে পাহাড়ধ্বসে অসংখ্য প্রাণহানির ঘটনা। নিয়মিত পাহাড় ধ্বসের ঘটনা ঘটছে প্রায় প্রতি বছরই। এ পাহাড় ধ্বসের ঘটনা বারবার কেন ঘটছে? তা তদন্ত করলে বের হয়ে আসে সুবিধা ভোগী রাজনৈতিক নেতাদের ভূমিবাণিজ্য। র্দীঘদনি যাবত চট্টগ্রাম নগরীতে একশ্রণেীর রিয়লে এস্টেট ব্যবসায়ী পাহাড় কেটে এপার্টমেন্ট তৈরি করার কারণে অল্প বৃষ্টিতে পাহাড়ের পাদদেশ বিধ্বস্ত হয়ে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। কেউ কেউ ভূমি দখল দিয়ে আধা পাকা ঘর নির্মাণ করে ভূমিহীনদের কাছে কম দামে ভাড়া দেয়। গত ২০ বছরে চট্টগ্রামে ১১০টি পাহাড় নিশ্চিহ্ন হয়েছে। এ পাহাড় কাটার ফলে পুকুর, ডোবা, নদী, দীঘি ও অসংখ্য নালা ভরাট হয়ে গেছে। একটু বৃষ্টি হলে নগরীর এক পঞ্চমাংশ এলাকা পানিতে টইটুম্বুর হয়ে যায়। এতে করে পাহাড়ের পাদদেশ ধসে প্রাণহানরি ঘটনা ঘটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। মহানগরী চট্টগ্রামে ১ লাখ ও তিন পার্বত্য জেলায় ৩ লাখ মানুষ পাহাড়ের পাদদেশ ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। প্রতি বর্ষা মওসুমে এবং সারা বছর এ এলাকার পাহাড় ধসে অসংখ্য মানুষরে প্রাণহানি ঘটে চলছে।
বিভিন্ন অনুসন্ধানে জানা যায়, তিন পার্বত্য জেলার পাহাড়ি জনগোষ্ঠী, কক্সবাজার রোহিঙ্গা শরর্ণাথী ও চট্টগ্রাম মহানগরীর বস্তিবাসীরা পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করছে মানবেতের ভাবে। বর্ষা মওসুম আসলেই তাদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে পাহাড় ধস আতঙ্ক। পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি জেলায় কয়েক লাধিক পাহাড়ি এবং চট্টগ্রাম মহানগরীতে ১ লাধকি জনগোষ্ঠী পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করছে। নগরীতে একশ্রেণীর ভূমিদস্যু অবৈধভাবে পাহাড় দখল করে বসতবাড়ি তৈরি করে ভাড়া দিচ্ছে। বসবাসকারীরা হলো নিম্ন ও হতদরদ্রি শ্রেণীর জনগোষ্ঠী। ইচ্ছে মতো পাহাড় কেটে তৈরি করা এসব বস্তিতে অল্প বৃষ্টি পড়লে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠে।এসব পাহাড়গুলোর মালিক ভূমি মন্ত্রনালয়। ওইসব পাহাড়ে পরিবেশের ভারসাম্য রার দায়িত্ব পালন করছে পরিবেশ মন্ত্রণালয়। আর এসব এলাকায় ঘর, বাড়ি ও বস্তি নির্মাণের ব্যাপারে আপত্তি ও অনাপত্তি বিষয়টি দেখার দায়িত্ব গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের। জনগণ জানতে চায় তিন মন্ত্রণালয় এখানের পাহাড়গুলোর খোঁজ খবর কতটুকু রাখে? আর রাখবে না কেন? যদি বলে রাখি তাহলে এ চরম দূর্ভোগ কেন? আমাদের প্রশ্ন জাগে এক শ্রেণীর অসাধু মহল দখলদারের অবৈধ কর্মকান্ডের সুযোগ করে দিচ্ছে মন্ত্রাণালয়! জানার সময় এসেছে এরা কারা? এরা অবশ্যই রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ছত্রছায়ায় কিংবা সরকারি আমলা ও পদস্থ কর্মকর্তাদের আশীর্বাদ নিয়ে বস্তি তৈরি করে নিম্ন আয়ের মানুষ ও অন্যান্য জেলা থেকে আগত গৃহহীন খেটে খাওয়া দিনমজুরদের ভাড়া দিচ্ছে। আবার কেউ কেউ তাদের কাছে পাহাড়ি জমি ইজারা দিচ্ছে। জানা দরকার এদের প্রতিরোধ কবে হবে?
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এদিকে নজর দিচ্ছে না কেন? কেন প্রশাসন নীরব থাকছে? বর্তমান সরকার কার সরকার? সরকারের উচিত হবে এই বিষয়টিকে ভালো ভাবে গুর”ত্ব দেয়া। ছোট বড় ১১ টি পাহাড়ে বসবাসরত ১০ লাখ মানুষ ঝুকিতে আছে। চট্টগ্রামে পাহাড়ের পাদদেশে প্রায় ৬৮০ টি পরিবারের বসবাস। প্রশাসন এদের উচ্ছেদ করবে। গত আট তারিখে এদের সরে যাওয়ার কথা ছিল। সরে এরা যাবে কই? এদের পূনবার্সন কোথায় হবে? শিশু সন্তান কিংবা বৃদ্ধদের নিয়ে এই ভূমিহীনরা কেন নিজ দায়িত্বে বাসস্থান খুঁজে নিবে? নিজেরা খুঁজতে গেলে তারা আবারও কোন না কোন পাহাড়েরর পাদদেশে আশ্রয় নিবে। তাহলে জানা দরকার তাদের পূনবার্সনের জন্য বরাদ্দকৃত ২৭ একর জমি কার পেটে বদহজম হয়ে আছে! ২০০৭ সালে পাহাড় ধসের এই ঘটনার পরই চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে একটি কমিটি ২৮টি কারণ নির্ধারণ করেছিল। ৩৬টি সুপরিশ প্রণয়ন করলে তা আজও বাস্তবতার মুখ দেখেনি। এছাড়া পাহাড় ধসের পর পুনর্বাসনের ল্েয হাটহাজারী উপজেলার ফতেয়াবাদ এলাকায় প্রায় ২৭ একর জায়গা বরাদ্দ নেয়া ঘোষণা দিলেও তা শুধুমাত্র কাগজে কলমে আটকে আছে। সংশিষ্ট কর্তৃপ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের গাফিলতির কারণে প্রকল্পের কাজ আজও ঝুলে আছে।

অতীত খতিয়ানে চোখ রাখলে আমরা দেখি, ২০০৭ সালে ১১ জুন স্মরণকালের পাহাড় ধসের ট্র্যাজেডিতে নারী, পুর”ষ ও শিশুসহ প্রায় ১২৭ জনের প্রাণহানি। যাকে চরম মানবিক বিপর্যয় বলতে হয়। ২০০৮ সালে মতিঝর্ণায় একই স্থানে পাহাড় ধসে ১৪ জনের প্রাণহানি। অব্যাহত ভাবে, ২০১০ সালের পাহাড়ধ্বসে ৩০ জন, ২০১১ সালে ১৭ জন এবং ২০১২ সালে ২৮ জন। ২০০৭ সাল থেকে নিয়মিত ভাবে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটছে। বিগত ১৫ বছরের খতিয়ানে দেখা যায়, পাহাড় ধসে প্রায় ৪০০ লোকের প্রাণহানি ঘটেছে। এভাবে আর কত তাজা প্রাণ গেলে রাষ্ট্রের টনক নড়বে?