সড়ক খাতে বরাদ্দ বাড়লেও আশানুরূপ উন্নয়ন হচ্ছে না

বিশেষ প্রতিনিধি : দেশের সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নে প্রতি বছরই বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। নেয়া হচ্ছে নতুন নতুন প্রকল্পও। কিন্তু তারপরও যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে আশানুরূপ উন্নতি ঘটছে না। এ নিয়ে সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় নাখোশ। এ ব্যাপারে ইতিমধ্যে অর্থমন্ত্রী দেশের সড়কের মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, এতো বরাদ্দ দিয়েও দেশের সড়কের অবস্থা ভালো করা যাচ্ছে না। এজন্য নতুন করে আর কোনো সড়ক নির্মাণ করা হবে না। বরং এখন থেকে শুধুমাত্র বিদ্যমান সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন বাবদ বরাদ্দ দেয়া হবে। অর্থ, পরিকল্পনা ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশের সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়নে বিগত চার বছরে খাতে ১৪ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কিন্তু সে অনুপাতে দেশে মহাসড়ক বাড়েনি। বরং গত চার বছরে দেশে মাত্র ৮ কিলোমিটার নতুন মহাসড়ক যুক্ত হয়েছে। তাছাড়া সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণে চলতি অর্থবছরেও ৪ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা বরাদ্দ (সংশোধিত) ছিল। তার আগে ২০১৩-১৪, ২০১২-১৩ ও ২০১১-১২ অর্থবছরে এ খাতে যথাক্রমে ৩ হাজার ৬২৫ কোটি, ৩ হাজার ৬০৫ ও ২ হাজার ৮৪৭ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। কিন্তু এসময়ে মাত্র ৬ কিলোমিটার জাতীয় ও ২ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক নতুন যুক্ত হয়। তারপরও এ খাতে আগামী অর্থবছর ৫ হাজার ৬৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, বর্তমানে সারদেশে ৩ হাজার ৫৪৪ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক রয়েছে। তারমধ্যে চলতি অর্থবছর মাত্র ৬ কিলোমিটার নতুন যুক্ত হয়েছে। এর আগের তিন অর্থবছর জাতীয় মহাসড়ক অপরিবর্তিত ছিল। ওই সময় সারাদেশে জাতীয় মহাসড়ক ছিল ৩ হাজার ৫৩৮ কিলোমিটার। তাছাড়া বর্তমানে সারাদেশে আঞ্চলিক মহাসড়ক রয়েছে ৪ হাজার ২৭৮ কিলোমিটার। এর আগের তিন বছরে দেশে কোনো আঞ্চলিক মহাসড়ক নির্মাণ হয়নি। তবে ২০১১-১২ অর্থবছরে মাত্র ২ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক যুক্ত হয়। তাছাড়া গত ৪ বছরে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ৪ লেনসহ বেশকিছু প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইতিমধ্যে ওসব প্রকল্পের মেয়াদ একাধিকবার বাড়ানো হয়েছে। সড়ক উন্নয়নের এমন পরিস্থিতিতে হতাশ অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। বর্তমানে মাথাপিছু সড়কের হিসাবে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান সবার নিচে। বাংলাদেশে প্রতি হাজার মানুষের জন্য বর্তমানে সড়ক রয়েছে মাত্র দশমিক এক কিলোমিটার। অথচ মালদ্বীপে প্রতি হাজার মানুষের জন্য সড়কের পরিমাণ দশমিক তিন কিলোমিটার, নেপালে দশমিক আট, পাকিস্তানে ১ দশমিক ৫, আফগানিস্তানে ১ দশমিক ৬, ভারতে ৩ দশমিক ৫, শ্রীলংকায় ৫ দশমিক ৫ ও ভুটানে ৯ দশমিক ৭ কিলোমিটার। তাছাড়০া বাংলাদেশে যে পরিমাণ পাকা সড়ক রয়েছে, তাও অপ্রতুল। দেশের মোট সড়কের মাত্র ১০ শতাংশ পাকা (পেভড রোড), যেখানে আফগানিস্তানে পাকা সড়ক ২৯ শতাংশ, ভুটানে ৪০, ভারতে ৫০, নেপালে ৫৪, পাকিস্তানে ৭২ ও শ্রীলংকায় ৮১ শতাংশ। আর মালদ্বীপের শতভাগ সড়কই পাকা।
সূত্র আরো জানায়, এশিয়ান হাইওয়েভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের মহাসড়কগুলোর ভারবাহী ক্ষমতাও (এক্সেল লোড) সবচেয়ে কম। তা প্রতিবেশী ভারতের তুলনায় অর্ধেক। তাছাড়া পাকিস্তান, ভুটানের চেয়েও বাংলাদেশের মহাসড়কগুলোর ভারবাহী ক্ষমতা কম। পাশাপাশি গুণগত মানের দিক থেকে খারাপ হওয়ায় বাংলাদেশের মহাসড়কগুলোয় দুর্ঘটনাও ঘটে বেশি। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে দুর্ঘটনাপ্রবণ মহাসড়কের চেয়ে ১০ গুণ বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে। আর অন্যান্য মহাসড়কের অবস্থাও একই রকম। ফলে বাংলাদেশের অধিকাংশ মহাসড়ক বিশ্বের ঝুঁকিপূর্ণ সড়কের তালিকায়ও রয়েছে।
এদিকে দেশের সড়কের মান নিয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী আহম মুস্তফা কামাল ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সম্প্রতি তিনি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের এক অনুষ্ঠানে বলেছেন- সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে সঠিক নিয়ম অনুসরণ করা হচ্ছে না। ফলে কিছুদিন যেতে না যেতেই সড়কের মান খারাপ হয়ে যাচ্ছে এবং চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। বর্তমানে দেশের মাত্র ৪ শতাংশ মহাসড়ক আন্তর্জাতিক মানের। অর্থাৎ বাকি ৯৬ শতাংশ নিম্নমানের। এটি কখনই গ্রহণযোগ্য নয়। তাছাড়া বর্ষা এলেই বেরিয়ে আসে সড়কের বেহাল চিত্র। এ খাতে বরাদ্দ বাড়লেও ভাঙাচোরা সড়কের অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে না।
অন্যদিকে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের দাবি দেশের সড়ক-মহাসড়কের মান গত কয়েক বছরের চেয়ে এখন ভালো। তার মতে, দেশের গুরুত্বপূর্ণ কোনো মহাসড়কেই ভাঙাচোরা নেই। কিছু সড়কে সমস্যা থাকলেও দ্রুত সেগুলো মেরামতের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তাছাড়া ঈদ ও বর্ষা সামনে রেখে ২৩ জুন আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা আহ্বান করা হয়েছে। সেখানেও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হবে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির সহসভাপতি রুস্তম আলী জানান, দেশে যানবাহন বাড়লেও সড়ক বাড়ছে না। বরং সড়ক ব্যবস্থাপনায় কয়েক দশক আগের পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। এ অবস্থা কখনই কাম্য নয়। বিষয়টি সরকারের গুরুত্বসহকারে দেখা জরুরি।
একই প্রসঙ্গে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী এম ফিরোজ ইকবাল জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ৪ লেনে উন্নীতকরণসহ কিছু প্রকল্পের কাজ আগামী অর্থবছরেই শেষ হবে। মূলত নানা কারণে এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন বিলম্বিত হওয়ায় গত ৪ বছরে দেশে মহাসড়কের পরিমাণ বাড়েনি। তাছাড়া সারাদেশে গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কগুলো চার লেন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন হলে আগামীতে সড়কের পরিমাণ অনেক বাড়বে।