শিশুশ্রম মুক্ত বাংলাদেশ যেভাবে গড়বেন… মোমিন মেহেদী

আমাদের দেশে সেই ছেলে হবে কবে/ কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে? কবির এই প্রশ্নের উত্তর আমি আজো পাই নি; পায় নি হয়তো দেশের ষোল কোটি মানুষও। আর তাই একজন নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে কবির সেই কাজে বড় হওয়ার চেষ্টা থেকে এগিয়ে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত। যেই এগিয়ে চলার হাত ধরে রাজনীতি-অর্থনীতি-শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি ও সমাজ নিয়ে ভাবছি। কাজ করছি শিশু-কিশোরদের জন্য, নতুন প্রজন্মের জন্য। আর তাই চাই শিশু শ্রম মুক্ত বাংলাদেশ। যদিও ব্রিটেনে ৩৫ লাখ শিশুর দারিদ্রের মধ্যে বসবাস করে; আর বাংলাদেশে শিশু-কিশোরদের মধ্যে প্রায় ৭০ লক্ষ থাকে অর্ধাহারে অনাহারে। এতসব খবর রাখার সময় নেই আমাদের রাজনীতিক-অর্থনীতিক আর আমলা-মন্ত্রীদের। তাদের সময় আছে কেবল-ই টক- শো, টেবিল টক আর আলোচনা সভা করার। সেই আয়োজনগুলোতে তারা অনেক বড় বড় গলায় বলেন, উন্নয়নের এই ধারা আমাদের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনার অবদান। কিন্তু তারা একবারের জন্যও এই নিগৃহিত শিশুদের কথা ভাবেন না, ভাবেন না সেই সকল শিশুদের কথা; যাদের রাত আর দিনের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তবে তারা আমাদের দেশের শিশুদের চেয়ে বিদেশি শিশুদের কথাই বেশি ভাবতে ভালোবাসেন। যে কারণে আমাদের দেশে শিশু উন্নয়নে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক কন্যা শেখ হাসিনার পরিবারের কেউ তো নয়-ই এমনকি খোদ শিশু ও মহিলা বিষয়ক মন্ত্রী ও সচিব পিছিয়ে রয়েছেন; এই মহান দায়িত্বটি পালনে। যে কারণে আমাদের শিশু একাডেমি এখন তাদের দখলে যাঁরা ক্ষমতাবান; আমাদের শিশু কল্যাণ তহবিলের অর্থ বরাদ্দ পায় মন্ত্রী এমপিদের ভাগ্নি আর ভাতিজীরা। সাথে সাথে তাদের কথা না ভেবে ব্রিটেনে শিশুদেরকে নিয়ে কাজ করার জন্য ওয়াদাবদ্ধ হয়ে সম্প্রতি এমপি হয়েছেন শেখ পরিবারের সন্তান শেখ রেহানা; শুধু কি এখানেই শেষ তারা রাজনীতিক কৌশলে এগিয়ে যেতে যেতে ভুলতে বসেছেন নতুন প্রজন্মের কথাও। যাঁরা আগামীতে দেশ গড়বে, জাতি গড়বে; তাদেরকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছেন আর ভাবছেন নিজেদের বর্তমান আর ভবিষ্যতের কথা। এই সুযোগে সারাদেশে প্রায় ৭০ লাখ নিষিদ্ধ শিশু শ্রমের শিকার হচ্ছে। অসুস্থ্য হচ্ছে প্রতিবছর হাজার হাজার শিশু-কিশোর। যাদের বয়স ১৩ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে এমন শিশু-কিশোরের একটা বড় অংশ শিশু শ্রম-ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমের কারণে মৃত্যুবরণ করছে। বেসরকারি এক জরিপে অবশ্য স্পস্ট করে বলা হয়েছে যে, প্রতিবছর গড়ে ৩ হাজার শিশু কিশোর বিড়ি কারখানায়, প্লাস্টিক কারখানায় এবং ট্যানারীতে শ্রম দিতে গিয়ে অসুস্থ্য হচ্ছে এবং মৃত্যুবরণ করছে। অবশ্য সারাদেশে প্রায় ৩৫ লাখ নিষিদ্ধ শিশু শ্রমের শিকার হচ্ছে বলে সরকার শিকার করেছে। তবে বলা হয়ে থাকে যে, সরকারি স্বীকারোক্তির সাথে সাথে একটা বড় অংশ থেকে যায় লুকোচুরির খেলায়। যে খেলায় আমাদের শিশু-কিশোরেরা অন্ধকারে আবদ্ধ হচ্ছে; অন্ধকারের দিকে ধাবিতে হচ্ছে তাদের সোনালী ভবিষ্যত। যে বয়সে তাদের খাতা কলম নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা। ঠিক সে বয়সে শুধু পিতা-মাতার দারিদ্রের কারণে ওরা শিশু শ্রমিক। শুধু তাই নয় এসব শিশুদের বৃহৎ অংশ রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে। মে দিবসেও বন্ধ থাকে নি কী শিশু শ্রম। বিগত সময়ে বারবার সরকারিভাবে শিশুশ্রম বন্ধ করার ঘোষণা দেওয়া হলেও তা বন্ধ হয়নি। তবে কে নেবে এসব শিশুদের শিা চিকিৎসা ও খাবারের দায়িত্ব? কেউ নেই এই দায়িত্ব নেয়ার। শুধু মুখে মুখেই বলা হচ্ছে শিশু-কিশোরদেরকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। আসলে হচ্ছে তার উল্টোটা। এই উল্টো সময়কে পাল্টে দিতে হলে; পরিবর্তন করতে হলে সকলকে সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশের রাজনীতি-অর্থনীতি-শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতিসহ প্রতি স্তরের দিকে দৃষ্টি দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে দেশে শূন্য থেকে ১৭ বছর বয়সের শিশুর সংখ্যা ৬ কোটি ৭৭ লাখের বেশী। এদের মধ্যে প্রায় ৩৫ লাখ শিশু নানা ধরনের কাজের সঙ্গে জড়িত। মোট শিশু শ্রমিকদের মধ্যে ১৩ লাখ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে। এদের কাজ দেয়ার েেত্র প্রতিষ্ঠানের মালিকরা স্থানীয় বা আন্তর্জাতিক কোনো আইনের তোয়াক্কা করে না। এমনকি মুজুরি কম দিয়ে প্রতিনিয়তই তাদের ঠকাচ্ছে। সংবিধানের ৩৪ নম্বর অনুচ্ছেদ উপো করে শিশুদের দিয়ে জোর করে কাজ করিয়ে নেয়া হচ্ছে। অথচ এখন পর্যন্ত শিশু শ্রমের দায়ে বাংলাদেশে একজনকে শাস্তি পেতে হয়েছে তার প্রমাণ পাওয়া যায় না। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে শিশুর বয়স নির্ধারণ নিয়ে জটিলতার কথা। কত বছর বয়স পর্যন্ত শিশু হিসেবে ধরা হবে তা সুনির্দিষ্টভাবে আইনে বলা নেই। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) শিশু আইনের বিভিন্ন ধারায় কাজের ধরনের েেত্র শিশুর বয়স নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কাজের েেত্র বলা হয়েছে, ১৬ থেকে ১৮ বছরের শিশুরা এই কাজ করতে পারবে। ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সের শিশুরা হালকা পরিশ্রমের কাজ করতে পারবে। অন্য দিকে বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালের শিশু আইনে ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত একজনকে শিশু হিসেবে ধরা হয়েছে। আবার জাতীয় শিশু নীতিতে ১৪ বছর বয়সের কাউকে শিশু হিসেবে চিত্রিত করার বিধান দেওয়া আছে। ফলে ভিন্ন ভিন্ন বয়সের এ জটিলতায় শিশুদের বিভিন্ন ধরনের কাজে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। আইনে শুণ্য থেকে ১২ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের সবধরনের শ্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ৫ বছর বয়সের শিশুকেও জোর করে নানা ধরনের কাজে নিয়মিত ব্যবহার করা হচ্ছে।
সরকার ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধে আইএলও এর ১৮২ সনদে সনদে সার করলেও আদৌ কোনো নিয়মই মানা হচ্ছে না; হচ্ছে না আইনের যথাযথ প্রয়োগ। আর এর পেছনে রয়েছে সরকারের একটা বড় অংশের দুর্নীতি। এই দুর্নীতি রোধ না করতে পারলে কখনোই শিশু শ্রম বন্ধ হবে না। যা থাকবে, তা শুধু কাগজে আর কলমে; যা আমাদের জন্য ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে আসতে পারে। আর তাই আইন অনুযায়ী শিশু বিক্রি, পাচার, ভূমি দাসত্ব, বেশ্যাবৃত্তি, অশ্লীল দৃশ্যে অভিনয়ের জন্য শিশুর ব্যবহার, মাদকদ্রব্য উৎপাদন, মাদক পাচারে শিশুর ব্যবহার করাকে যেহেতু ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে; সেহেতু দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে; বাংলাদেশের জাতির জনকের কন্যা হিসেবে শেখ হাসিনাকে আইনের বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে একটি সত্যিকারের সোনার বাংলাদেশনির্মাণের জন্য নিবেদিত থেকে এগিয়ে যেতে হবে। তা না হলে আমরা যেভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবো, ঠিক একইভাবে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্থ হবে। কেননা, জনবলকে সম্পদে পরিণত করে অনেক দেশ শীর্ষ উন্নত দেশ হিসেবে এগিয়ে গেছে। সেই এগিয়ে যাওয়াটা আমাদের পক্ষেও সম্ভব; তা কেবল আমাদের শিশু-কিশোরকে রক্ষার মধ্য দিয়ে।তাছাড়া প্রধানমন্ত্রী খুব ভালো ভাবেন চান যে, যেহেতু এই সনদ অনুযায়ী ১৬ থেকে ১৮ বছরের কম বয়সের কোনো শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে পারবে না। সেহেতু এই আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে শিশু শ্রম বন্ধে তিনি উদ্যেগ গ্রহণ করবেন বলে আমি অন্তত আশা করতে পারি। একজন লেখক হিসেবে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে তৈরি নগণ্য নাগরিক হিসেবে বলবো, বাংলাদেশকে বাঁচান। তা না হলে ক্ষতির মুখোমুখি হতে হবে আমাদের সবাইকে। অতিতে অনেকবার অবশ্য শিশু শ্রম বন্ধে উদ্যেগ গ্রহণ করা হয়েছিলো। বিশেষ করে রাজনীতিতে তৈরি না হলেও দেশপ্রীতিতে তৈরি এইচ এম এরশাদের শাসনামলে তার উদ্যোগে ‘পথকলি’ প্রকল্প চালু করা হয়েছিলো। যাকে পরবর্তীতে খালেদা জিয়ার সরকার গলা টিপে হত্যা করেছিলো; আর দাফন সম্পাদন করেছিলো শেখ হাসিনার সরকার। মাঝখানে নির্মমতার রাস্তায় আবারো পথিক হয়েছে আমাদের শিশু; আমাদের কিশোরেরা। তারই ধারাবাকিতায় বর্তমানে দেখা যাচ্ছে ৫ বছর থেকে ১৭ বছর পর্যন্ত ১৩ লাখের বেশি শিশু এসব কাজের সঙ্গে জড়িত। ঝুঁকিপূর্ণ কাজ সংক্রান্ত আইএলও সনদে সার করার পর থেকে ১৬ বছরের কম বয়সের যেসব শিশু এধরনের কাজ করছে তাদের বিরত রাখার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু বাস্তবে সরকার তেমন কিছু করছে না। কিন্তু এভাবে বাংলাদেশকে কোনো অন্ধকার গহ্বরের দিকে ঠেলে দিতে পারি না বলেই বারবার বলছি, বারবার লিখছি; প্রয়োজনে রাজপথে নামবো;তবুও বাংলাদেশে শিশু শ্রম বন্ধ করেই ছাড়বো ইনশাল্লাহ। আর সেজন্য অবশ্য আপামর জনসাধারণের সচেতনতাও অনেক কাজে আসতে পারে বলে ধারণা করছি। আর তাই সকলের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি, আজকের শিশু শ্রমিক আগামীতে অন্ধকারের নাগরিক হওয়ার আগেই আসুন সচেতন করি নিজেকে, সমাজকে, দেশকে…আর সেই সাথে ¯োগান তুলুন- ‘আমাদের দেশে শিশু শ্রম যেন থাকে না/ আর কোনো শিশু তার মৃত্যুও আঁকে না/ সকলের জন্য নিবেদিত থাকি আজ/ দেশ ও জাতির প্রয়োজনে নতুনকে ডাকি আজ…
মোমিন মেহেদী :

                                                                                                    চেয়ারম্যান, নতুনধারা বাংলাদেশ-এনডিবি