হিল্লা বিয়ের ফতোয়ায় দেড় বছর সমাজচ্যুত দম্পতি

বগুড়া প্রতিনিধি : বগুড়া শাজাহানপুরে মাতব্বরদের চাপে রাগের মাথায় স্ত্রী জোসনা বেগম (৩০)কে তালাক দিয়ে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেন দিনমজুর রুহুল আমিন (৩৫)। নিজের ভুল বঝুতে পেরে এক মাসের মাথায় আবারও নোটারী পাবলিকে অ্যাফিডেভিট করে স্ত্রীর সঙ্গে সংসার শুরু করেন। মাতব্বরদের ভয়ে একবছর ধরে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে বেড়ান। পিতৃভিটার টানে ছয়মাস আগে ফিরেন নিজের গ্রামে। এবার মাতব্বরেরা ‘হিল্লা বিয়ে’ ও দোররা মারার ফতোয়া জারি করেন। হিল্লা বিয়েতে রাজি না হওয়ায় ছয় মাস ধরে ওই দম্পতির সঙ্গে বৃদ্ধ বাবা-মাকেও ‘একঘরে’ ও সমাজচ্যুত করে রেখেছেন গ্রামের মাতুব্বরেরা। এখন দম্পতির সঙ্গে তাঁর বৃদ্ধ বাবা-মায়েরও সঙ্গেও মেলামেশা বন্ধ। গ্রামের কেউ কাজে নিচ্ছেন না। কোন বিয়ে শাদী বা গ্রামের সামাজিক অনুষ্ঠানে অঘোষিতভাবে ‘নিষিদ্ধ’ পরিবারটি। এ সবের পর অবশেষে সাংবাদিকদের সহযোগীতায় ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপে দেড় বছর পর মুক্ত জীবন যাপন করার সুুযোগ পেলো এক ঘরে এই পরিবারটি ।‘হিল্লা বিয়ে’তে রাজি না হওয়ায় তালাকের এই ঘটনা ঘটেছে বগুড়ার শাজাহানপুর ও নন্দীগ্রাম উপজেলার সীমান্তবর্তী কাবাষট্রি গ্রামে। শাজাহানপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিষয়টি জানার পর একমাস আগে ফতোয়াবাজ মাতব্বরদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দিলেও মঙ্গলবার পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
গত বুধবার সরেজমিনে শাজাহানপুর কাবাষট্রি গ্রামে গিয়ে ফতোয়ার শিকার দম্পতি ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানাগাছে, প্রায় একযুগ আগে নন্দীগ্রাম উপজেলার কহুলী গ্রামের মৃত দুদু মিয়ার কন্যা জোসনা বেগমকে বিয়ে করেন কাবাষট্র গ্রামের আবদুর রশিদের পুত্র দিনমজুর রহুল আমিন। দাম্পত্য কলহের জের ধরে গতবছরের জানুয়ারী মাসে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিবাদ বাঁধে। পরে স্থানীয় ইউপি সদস্যের উপস্থিতিতে দুজনের বিবাদ মিটমাট করে দেওয়া হয়। দুজনের মধ্যে সমঝোতা হলেও কয়েকজন গ্রাম্য মাতব্বর প্রচারন করেন, ‘রুহুল আমিন তাঁর স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন’। এ ঘটনায় পরদিন আবারও শালিস বসিয়ে কাজি ডেকে তালাকের কাগজে স্বার করানোর পর জোসনাকে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
একমাস না যেতেই মাতব্বরেরাই অন্য মেয়ের সঙ্গে রুহুল আমিনের বিয়ে ঠিক করেন। বিষয়টি জানতে পেরে দুই সন্তানকে নিয়ে স্ত্রী জোসনা বেগমের কাছে পালিয়ে গিয়ে তাঁকে নিয়ে ঘরসংসার করার কথা বলেন। বিষয়টি জানার পর বগুড়া শহরের এক মুফতীর (মাওলানা) কাছে শরিয়া মোতাবেক ফয়সালা চান জোসনার পরিবার। মুফতি ওয়াক্কাস ফয়সালায় বলেন,‘ এক বৈঠকে তিন তালাক বৈধ নয়। যেহেতু এক তালাক হয়েছে এখন স্ত্রীকে নিয়ে ঘর সংসারের ইচ্ছা পোষন করলে ঘর সংসার করতে পারবেন।’
মুফতির দেওয়া ওই ফয়সালা মোতাবেক গতবছরের ৩০ জানুয়ারী নোটারী পাবলিকে অ্যাভিডেভিট করে জোসনার সঙ্গে ঘর সংসার শুরু করেন। এ খবর গ্রামে ছড়িয়ে পড়লে মাতব্বরেরা ফতোয়া দেন, ‘হিল্লা বিয়ে’ ছাড়া জোসনার সঙ্গে ঘর সংসার বৈধ নয়। মাতব্বরদের ভয়ে প্রায় একবছর গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে থাকেন রুহুল আমিন।
জোসনা ও রুহুল আমিনের ভাষ্যমতে, এ বছরের জানুয়ারীর দিকে তাঁরা মাতব্বরদের ফতোয়া উপো করে কাবাষট্রি গ্রামে আসেন। গ্রামে ফেরার পর মাতব্বরেরা একাধিক দফা শালিস বৈঠক বসান। বৈঠকে আমিরুল ইসলাম, ফারুক হোসেন , সোনা উল্লাহ, আকু,টুলু মেম্বার, বেলাল হোসেনসহ মাত্বব্বরেরা ফতোয়া জারি করেন, হিল্লা বিয়ে ছাড়াও ৩১৫ দিন অন্যের সঙ্গে ঘর সংসার এবং দুজনকে ৮০ দোররা মারার পর সমাজে তোলা হবে। এর আগে কেউ তাঁদের সঙ্গে মিশতে পারবেনা।
জোসনা বেগম অভিযোগ করেন, গ্রামে ফেরার পর সমাজচ্যুত করা ছাড়াও তাঁদের সঙ্গে মেলামেশায় অঘোষিত নিষেধাঙ্গা জারি করা হয়।

তিনি বলেন, দিনমজুর স্বামীকে কেউ কাজে নেয়না,অন্য গ্রামে গিয়ে তিনি দিনমজুরী দেন। গ্রামে কোনো বিয়েশাদি,মিলাদ মাহফিল কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে তাঁরা নিষিদ্ধ।
রুহুল আমিন বলেন, ‘একঘরে’ করে রাখায় কয়েকদিন আগে বড় ভাইয়ের মেয়ের বিয়েতে স্বামী-স্ত্রী ছাড়াও ছোট দুই ছেলে-মেয়েকে নিষিদ্ধ করা হয়। বিয়ের আগের দিন স্ত্রীকে নিয়ে গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র যাওয়ার জন্য মাতব্বরেরা চাপ দেন। বাড়িতে আমার গরুকে খাবার দেওয়ায় বৃদ্ধ বাবা-মাকেও ‘একঘরে’ করার ফতোয়া জারি করা হয়।’
তিনি বলেন,‘ ব্র্যাকের মাধ্যমে বিষয়টি শাজাহানপুরের ইউএনওকে জানানোর পর তিনি নিজ কার্যালয়ে মাতব্বরদেরকে ডেকে অঙ্গীকার নেন। সেখানে তাঁরা অঙ্গীকার করে একঘরে করে রাখার ফতোয়া তুলে নেবে। কিন্ত গ্রামে ফিরে উল্টো আমিরুল নামে এক মাতব্বর শাররীকভাবে আমার উপর নির্যাতন চালান। এরপর গ্রামে মজলিসের অনুষ্ঠানে আমাদেরকে নিষিদ্ধ করা হয়। গ্রামের মাজারে এবং মসজিদে শিরনি দিতে গেলে তা ফেরত দেওয়া হয়।
রুহুল আমিনের বৃদ্ধ বাবা আবদুর রশিদ (৭৫) বলেন,‘লাতনির বিয়্যা। বাড়িত কত আলন্দ। রুহুলের গরু লাড়ায় আগের রাতত হামাক তওবা পড়ান হলো। তারপর বড় বেটা রাতত অ্যাসে দাওয়াত দিয়্যা গেল। বেন বেলা হতে না হতেই সেই দাওয়াত ফেরত লিয়্যা গেল। একন ছেলের বউয়ের সাথে হামরাও অ্যাক ঘরে।’
প্রতিবেশী আবু সাঈদ বলেন, একবছর পর রুহুল আমিন গ্রামে ফেরার পর মাতব্বরেরা পাশের নুনদহ মাদ্রাসার সাবেক উপাধ্য মাওলানা আবুল বাশার মো. আজাহার আলীর কাছ থেকে ফতোয়া নিয়ে আসেন। ওই ফতোয়া অনুযায়ী হিল্লা বিয়ে, ৮০ দোররা এবং ৩১৫ দিন অন্যের সঙ্গে ঘর সংসার ছাড়া ছাড়া স্বামী-স্ত্রীর ঘর সংসার করা যাবেনা বলে জানিয়ে দেওয়া হয়। কিন্ত হিল্লা বিয়েতে রুহুল রাজি না হয়ে ইউএনও’র কাছে বিচার চেয়েছেন।
মঙ্গলবার বিকালে পাশের নুনদহ গ্রামে গিয়ে মাওলানা আবুল বাশার মো. আজাহার আলীর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ফতোয়া দেওয়ার কথা অস্বীকার করে বলেন, ‘কাবাষট্রি গ্রামের মাতব্বরেরা আমার কাছে ফতোয়া নিতে এসেছিলেন। আমি ফতোয়া দেইনি।’
এদিকে মঙ্গলবার বিকালে অভিযুক্ত মাতব্বরদের বাড়িতে গেলে সাংবাদিকদের আসার খবর পেয়ে তাঁরা আত্মগোপন করেন।
রুহুল আমিনের ভাষ্যমতে, ইউএনওকে অভিযোগ দেওয়ার পর তিনি মাতব্বরদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য শাজাহানপুর থানা পুলিশকে নির্দেশ দেন। কিন্ত অদ্যবধি কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো গতকাল মঙ্গলবার স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও ব্র্যাকের মানবাধিকার ও আইন সহায়তা কর্মসূচীর কর্মকর্তা শাজাহানপুর থানায় ডেকে মাতব্বরদের সঙ্গে মিমাংসার জন্য চাপ দেন।
জানতে চাইলে ব্র্যাকের মানবাধিকার ও আইন সহায়তা কর্মসূচীর শাজাহানপুর উপজেলার সংগঠক আবদুল বাশির বলেন, ‘জোসনা বেগম ব্য্রাকের মাধ্যমেই মাতব্বরদের বিরুদ্ধে ইউএনও’র কাছে অভিযোগ করেছিলেন। গতকাল মঙ্গলবার চেয়ারম্যানসহ থানায় বসে মাতব্বরদের সঙ্গে আপোষ করে দেওয়া হয়েছে।’
গোহাইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান (ইউপি) আলী আতোয়ার বলেন, ‘ ফতোয়ার কোনো ঘটনা নয়; প্রতিবেশীরা রুহুল আমিনের শিরনী না নেওয়ায় তাঁদের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হয়েছিল। ইউএনও’র কাছে অভিযোগ দাখিলের পর গতকাল থানায় বসে তা আপোষ করে দেওয়া হয়েছে।’একই কথা বলেন শাজাহানপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) এনায়েত কবির। তিনি বলেন, ‘গ্রামে তদন্তে গিয়ে ঘরে ঘরে সবাইকে জিজ্ঞাসা করেছি। সেখানে ফতোয়ার ঘটনা ঘটেছে-এমনটা কেউ বলেননি।’
শাজাহানপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা(ইউএনও) মোহাম্মদ রুবায়েত খান বলেন, প্রতিবেশীরা শিরনি না নিলে কী করার আছে? হিল্লা বিয়ে এবং একঘরে করার অভিযোগ পেয়ে মাতব্বরদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য একমাস আগে শাজাহানপুর থানা পুলিশকে লিখিত নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ’তবে শাজাহানপুর থানার অফিসার ইনচার্জ আব্দুল মান্নান বিষয়টি বুধবার সকালে ইউপি চেয়ারম্যানসহ নিষ্পত্তি করেন। তিনি জানান রুহুল আমিন ও জোসনা বেগমকে থানায় ডেকে সমস্যা আছে কিনা আর জানতে চাইলে তারা জানান, এখন আর কোন সমস্যা নাই। তার পরেও শুক্রবারে ইউপি চেয়ারম্যান ও এলাকাবাসীকে সাথে নিয়ে গ্রামে একটি বৈঠক করে ঘটনাটির পুরোপুরি নিষ্পত্তি করা হবে বলে জানান।