রমজানে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি

এ.কে.এম মহিউদ্দীন: মূলত রজব থেকেই শুরু হয় রমজানের প্রস্তুতিপর্ব। রজব মাস শুরু হলে নবী করিম (সা.) দোয়া করতেন, ‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রাজাবা ওয়া শাবান ওয়া বালি্লগনা রামাদ্বান’— ‘হে আল্লাহ রজব ও শাবান মাসকে আমাদের জন্য বরকতময় কর এবং রমজান মাসকে বরণ করার তৌফিক আমাদের দান করো।’ এ হাদিসের ওপর আমল করতে গিয়ে আমাদেরও উচিত প্রত্যেক নামাজ শেষে বা যখনই মনে পড়বে দোয়াটি পাঠ করা আর রমজানের অফুরন্ত রহমত ও নেয়ামত বরণ করার জন্য মন ও জীবনকে প্রস্তুত করা।

রমজানে অফুরন্ত রহমত ধারায সিক্ত হতে আমাদের প্রত্যেককে প্রস্তুত করতে হবে নিজের মনটাকে। মনের আয়নাটা ঝকঝকে না হলে মুক্তি মিলবে কীভাবে বলুন। মনের ভেতরের যাবতীয় মলিনতা দূর করে তবে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে পবিত্র রমজানের। আর এর জন্য সবার আগে দরকার তওবা। তওবা অর্থ আগেকার সব গোনাহের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে মার্জনা চাওয়া। ভবিষ্যতে সে কাজ আর করবে না মর্মে মনে মনে ওয়াদা করা। যদি অন্য মানুষের হক নষ্ট করা বা মনে আঘাত দেয়ার ব্যাপার হয়, অবশ্যই তা পরিশোধ করতে হবে বা ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে আর নিজের আচরণ শোধরাতে হবে।

এপর্যায়ে আসুন জেনে নিই রমজানের প্রস্তুতির জন্য আল্লাহ্‌র রাসূল (সা.) কী ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন। হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সা.) শাবান মাস অপেক্ষা বেশি আর কোনো মাসে রোজা রাখতেন না। কারণ তিনি শাবান মাসের অল্প কয়দিন ব্যতীত পুরো মাসই রোজা রাখতেন।(বুখারী ও মুসলিম)

এ থেকে আমরা অবগত হলাম, মহানবী (সা.) রমজান মাসের প্রস্তুতির জন্য অন্য মাসের চেয়ে শাবান মাসে বেশি রোজা রাখতেন। অর্থাৎ এ হলো তাঁর রোজার প্রস্তুতি পদ্ধতি। এ বিষয়ে তিরমিজি শরীফের ৩৪৫১ নং হাদিসে এসেছে তালহা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন রাসূল (সা.) নতুন চাঁদ দেখতেন তখন তিনি সর্বদাই আল্লাহ্‌র প্রশংসা করতেন এবং তিনি বলতেন, হে আল্লাহ! এ চাঁদকে আমাদের ওপর উদিত করুন নিরাপত্তা, শান্তি, ঈমান ও ইসলামের সাথে (হে চাঁদ) তোমার ও আমার প্রভু একমাত্র আল্লাহ। হে আল্লাহ এ চাঁদ যেন সঠিক পথের কল্যাণের কারণ হয়।

অবশ্য রাসূল (সা.) নতুন চাঁদ দেখলেই শুধু মাত্র রমজান মাসের নতুন চাঁদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিলো না বরং সব নতুন চাঁদের ক্ষেত্রেই এসব করতেন।

রমজানের আগমনী একটি খুতবা এখানে আমরা পেশ করছি। এটি হযরত সালমান ফারসী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন একদা রাসূল (সা.) শাবান মাসের শেষ তারিখে এক বক্তৃতায় আমাদেরকে বললেন, হে, লোক সকল তোমাদের প্রতি ছায়া বিস্তার করেছে একটি মহান মাস-মোবারক মাস, এমন মাস যাতে একটি রাত আছে যা হাজার মাস অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ। আল্লাহ উহার রোজাসমূহকে করেছেন (তোমাদের জন্র) নফল। যে ব্যক্তি এ মাসে আল্লাহ্‌র নৈকট্য অর্জনের উদ্দেশ্যে একটি নফল কাজ করল, সে ওই ব্যক্তির সমান হলো, যে অন্য মাসে একটি ফরজ আদায় করল। আর যে ব্যক্তি এ মাসে একটি ফরজ আদায় করল, সে ওই ব্যক্তির সমান হলো, যে অন্য মাসে সত্তরটি ফরজ আদায় করল। উহা ধৈর্যের মাস। আর ধৈর্যের প্রতিদান জান্নাত। উহা সহানুভূতি প্রদর্শনের মাস। ইহা সেই মাস যাতে মুমিনের রিজিক বৃদ্ধি করা হয়। যে এ মাসে কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, সেটা তার জন্য তার পাপরাশির ক্ষমাস্বরূপ হবে এবং দোজখের আগুন হতে মুক্তির কারণ হবে। এছাড়া তার সওয়াব হবে সে রোজাদার ব্যক্তির সমান অথচ রোজাদারের সওয়াবও কম হবে না। উপস্থিত সাহাবীগণ বলেন, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! আমাদের প্রত্যেক ব্যক্তি তো এমন সামর্থ্য রাখে না, যা দ্বারা রোজাদারকেই ইফতার করাতে পারে? নবী করিম (সা.)বলেন, আল্লাহ্‌ তায়ালা এ সওয়াব দান করবেন ওই ব্যক্তিকে যে রোজাদারকে ইফতার করায় এক চুমুক দুধ দ্বারা অথবা একটি খেজুর দ্বারা অথবা এক চুমুক পানি দ্বারা। আর যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে তৃপ্তিসহ খাওয়ায়, আল্লাহ্‌ তায়ালা তাকে আমার হাওজ (কাওসার) থেকে পানীয় পান করাবেন যার পর পুনরায় সে তৃষ্ণার্ত হবে না জান্নাতে প্রবেশ পর্যন্ত। এটা এমন মাস যার (১০ দিন) প্রথম দিক রহমত, মধ্যম (১০ দিন) দিক মাগফিরাত আর শেষ (১০ দিন) দিক হলো জাহান্নাম থেকে মুক্তি। আর যে এ মাসে নিজ দাস-দাসীদের (অধীনের) প্রতি কার্যভার কমাবে আল্লাহ তায়ালা তাকে ক্ষমা করে দেবেন এবং তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করবেন।(মিশকাত)

আমরা এতক্ষণে জানলাম যে, রমজান মাসকে স্বাগত জানানোর জন্য তার বিশেষ আয়োজন ছিলো তা হলো তিনি সাধারণত জনতাকে এই বরকতময় মাস আগমনের বিষয়ে সতর্ক করতেন। এ সব হাদিস থেকে স্পষ্টভাবে জানা গেল মহানবী (সা.) রমজান মাসকে কীভাবে স্বাগত জানাতেন এবং সাহাবীদেরকে কীভাবে এই মাসের সুসংবাদ জানাতেন।

প্রিয় পাঠক, আপনাদের কাছে আমাদের সবিনয় নিবেদন-আসুন আমাদের সামনে যে রমজান আসছে তা পালনের জন্য সার্বিক ভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করি। এখন থেকে প্রতিটি মুহূর্তে এ বরকতময় মাসের আগমনী বার্তায় আসুন সকলে খোজ মেজাজে স্মরণ করি পহেলা রমজানের জন্য। রমজান সকল মাসের সেরা মাস। আল্লাহ্‌ যেন আমাদের সকলকে রহমত, মাগফেরাত ও নাজাতের মাস রমজানে কবুল করে নেন। আমিন।

লেখক : গবেষক ও প্রাবন্ধিক