শ্রমিকের সাথে সদাচার

মো: আব্দুস সোবহান: প্রথমেই একটি কথা বলে নিতে হচ্ছে, বছর বছর মে মাসের প্রথম তারিখটা ফিরে আসলেই তোড়জোড় শুরু হয়ে যায় শ্রমিকের অধিকার নিয়ে আলোচনায়। তা নিয়ে সকলে তাদের আলোচনার ঝাঁপি তুলে ধরেন। মানুষদেরকে নিয়ে যান তাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। সাম্যবাদের আওয়াজ উচ্চকিত হয় সর্বত্র। তথাপি সহজেই আবার সেই আলোচনা নিমিষেই মিলিয়ে যায়। আমরা চাই এভাবে মিলিয়ে যাওয়া নয়, আলোচনা-পর্যালোচনা হোক অব্যাহত। সেই চিন্তার সূত্রমুখ খুলে দিতেই আমার এই সংক্ষিপ্ত নিবেদন।

ইসলামী সমাজ শান্তিপূর্ণ সমাজ। এ সমাজে মানুষ সবাই ভাই ভাই, মানুষ মানুষে ভেদাভেদ থাকবে না। মানুষ শুধু আল্লাহকেই প্রভু বলে স্বীকার করবে। মানুষ মানুষের গোলামী করবে না বা করতে দেবে না। ইসলামী সমাজে কোন শ্রেণী বিদ্বেষ থাকবে না। ইসলামী সমাজের লক্ষ্য হবে একই আল্লাহ্‌র আনুগত্যে সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। সমাজের কর্ম ও সাধনা থাকবে গোটা মানুষের কল্যাণের জন্য। সমাজ হবে সম্পদ ও মানব-ঐশ্বর্যে সমৃদ্ধ। সমাজের লক্ষ্য হবে অন্যায়-অসত্যের দলন করে সুন্দরের প্রতিষ্ঠাসাধন। এই সুন্দর সমাজে মানুষ বিভিন্ন সুন্দর নামেই এক আল্লাহ্‌র নৈকট্য কামনা করবে এবং আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি হবে সমাজে ব্যক্তি-মানুষের লক্ষ্য।(৭:১৮০)।

এ থেকে প্রতিয়মান হয় শ্রেণীচেতনার জায়গা থেকে শ্রমিককে ইতরবিশেষ বিবেচনা করা যাবে না। সমাজের সব শ্রেণীর মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি করলেই চলবে না এটা বুঝতে পেরেছিলেন মহানবী (সা.)। তাই তিনি উৎপাদিত দ্রব্য যাতে গুটি কয়েক লোকের হাত পুঞ্জিতভূত না হতে পারে সেজন্য একদিকে যেমন সুদ, ঘুষ, চোরাকারবারী, প্রতারণা নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন, অপরদিকে যাকাত প্রদান বাধ্যতামূলক করাসহ অন্যান্য দান-খয়রাতকে উৎসাহিত করেছেন এবং শ্রমিক শোষণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন।

শ্রম শোষণ শুধু ব্যক্ত-শ্রমিককে আঘাত করে না, এজন্য শ্রমিক-মালিক বিবাদ বা শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দেয়। এতে সামগ্রিকভাবে উৎপাদন ব্যাহত হয়। তিন কারণে শ্রম অসন্তোষ দেখা দেয়-১. পারিশ্রমিক কম দেয়া; ২. শ্রমিককে তাঁর সাধ্যাতীত কাজ করতে বাধ্য করা;৩. মজুরী প্রদানে বিলম্ব করা কিংবা আত্মসাৎ করা। এ ব্যাপারে ইসলামী বিধান হচ্ছে-শ্রমিক-মালিক পরস্পরে ভাই। মালিক যা খাবে, শ্রমিকও তা খাবে, পরবে। সুতরাং এটা পরিস্কার যে, মজুরী নির্ধারণের ক্ষেত্রে তা বিবেচনায় আনতে হবে। শুধু কোনো রকমে বেঁচে থাক তত্ত্ব কিংবা চাহিদা-সরবরাহ-তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে মজুরী নির্ধারণ ইসলাম ইনসাফ বলে মনে করে না। ইসলামে কোনো শ্রমিককে তার সাধ্যাতীত কাজ দেয়া নিষিদ্ধ। শ্রমিককে তার দেহের ঘাম শুকানোর আগেই পারিশ্রমিক দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে মহানবী (সা.)-এর নির্দেশ হচ্ছে, ‘শ্রমিকরা তোমাদের ভাই। আল্লাহ এদেরকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন। সুতরাং তোমাদের উচিত তোমরা যা খাবে তাদেরকেও তা খাওয়াবে, তোমরা যা পরবে তাদেরকেও তা পরাবে এবং এয কাজ তাদের পক্ষে সম্ভব নয়, সে কাজের জন্য তাদেরকে কষ্ট দেবে না। শ্রমিকের পারিশ্রমিক তা ঘাম শুকানোর আগেই দিয়ে দাও।’

এ প্রসঙ্গে মহানবী (সা.)-এর আরো নির্দেশ রয়েছে-‘পারিশ্রমিকের হার নির্ধারণের পূর্বে কোনো শ্রমিককে কাজে লাগাতে পারবে না।’ কোনো কারণে শ্রমিক সরবরাহ বেড়ে গেলে কাজের সন্ধানে তাদের অন্যত্র যাবার অধিকার ইসলাম সংরক্ষণ করেছে। তদুপরি ইসলাম শ্রমিকদের মুনাফার অংশ দেয়ার কথা বলা হয়েছে। এ ব্যাপারে মহানবী (সা.)-এর নির্দেশ হচ্ছে- ‘শ্রমিক যে কাজ করে সে কাজের ফল থেকে তাকেও অংশ দাও। কেননা আল্লাহ তার শ্রমিকের বঞ্চিত করেন না।’

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিস এরকম: ‘মহানবী (সা.) বলেন, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, কিয়ামতের দিন আমি তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিবাদী হবো। যে ব্যক্তি আমার নামে শপথ করে, অতঃপর বিশ্বাসঘাতকতা করে, যে ব্যক্তি কোনো স্বাধীন মানুষকে বিক্রয় করে তার মূল্য ভোগ করে এবং যে ব্যক্তি শ্রমিক নিয়োগ করে তার থেকে পুরো কাজ করিয়ে নেয়, কিন্তু তার মজুরী দেয় না।’ পাঠক, লক্ষ্য করে থাকবেন, মহানবী (সা.) এমন একটি অর্থব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করেন যেখানে পুঁজির মালিক ও শ্রমিক নিয়োগকর্তাও নিয়োজিত হিসাবে নয়, বরং অংশীদার হিসাবে অংশগ্রহণ করে। এর ফলে ইসলামী অর্থনীতিতে মুজারাবা মুসাকাত, শিরকতে সানায়ে, শিরকতে উজুহ ইত্যাদি বহুবিধ ব্যবস্থার প্রচলন হয়েছে।

পুঁজিবাদী ধনতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সকল মুনাফা আত্মসাৎ করে পুঁজিপতি এবং সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থায় মুনাফা গ্রহণ করে রাষ্ট্র। অথচ উৎপাদনের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার শ্রমিক সমাজ বঞ্চিত এবং নিপীড়িত হয়-তারা পায় না তাদের ন্যায্য পাওনা। অথচ ইসলাম মুনাফায় শ্রমিকের অংশীদারিত্ব স্বীকার করে নিয়ে শ্রমিক সমাজকে মালিকের মর্যাদায় সমুন্নত করেছে। মহানবী (সা.) ঘোষণা করেছেন, শ্রমিকগণকে তার উৎপাদিত পণ্য থেকে অংশ প্রদান কর। কারণ আল্লাহ্‌র বান্দা এই শ্রমিকদেরকে কিছুতেই বঞ্চিত করা যাবে না। (কানজুল উম্মাল)

অতএব দেখা যাচ্ছে, মহানবী(সা.)-এর আদর্শগত শ্রেণীভেদহীন সমাজে মানুষকে সাম্যের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার জন্য অর্থনৈতিক যে সাম্য প্রতিষ্ঠিত করেছেন তা আধুনিক বিশ্বের অতি’ সাম্যবাদী’ তত্ত্ব মার্কসীয় অর্থনীতিও পারে নি। মুনাফায় শ্রমিকের অংশীদারিত্বের কথা নেই পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে এবং নেই সমাজবাদী ধারণায়ও। আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম যে চিন্তার বীজ বপন করে গেছেন, আশা করা যায় সেই সাম্যের এবং সমতার গানে আন্দোলিত হবে বিশ্বের চিন্তাশীল মানুষেরা।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট , ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড।