সান্তাল হুলের বিদ্রোহ বার্ষিক বাংলাদেশ আদিবাসী

নিজস্ব সংবাদ দাতা,নওগাঁ : সান্তাল হুলের ১৬০ তম বার্ষিকী। আজ থেকে ১৬০ বছর আগে সান্তাল জাতিগোষ্ঠী তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল তাদের অধিকার আদায়ের জন্য। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে প্রতিবছর সান্তাল হুল দিবস রাষ্ট্রীয় ভাবে উদ্যাপন করে বিদ্রোহের মহানায়ক চার ভাই সিদ-কানহু-চান্দ ও ভাইরবকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য। বাংলাদেশেও বিভিন্ন উন্নয়ন ও আদিবাসী সংগঠন দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় উদ্যাপন করবে।হুল সাঁওতালি শব্দ। যার বাংলা আভিধানিক অর্থ হলো বিদ্রোহ। ১৮৫৫ সালের ৩০জুন তারিখে সান্তাল সম্প্রদায়ের চার ভাই সিদ-কানহু-চান্দ ও ভাইরব এর নেতৃত্বে আদিবাসীরা ব্রিটিশ শাসকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। এ যুদ্ধের উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ সরকার ও তাদের দোসর অসৎ ব্যবসায়ী, মুনাফাখোর ও মহাজনদের নির্যাতনের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করা এবং একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।দামিন-ই কোহ ছিল সাঁওতালদের নিজস্ব অঞ্চল। বহু কষ্টে জঙ্গল কেটে, বন সাফ করে তারা জনপদ গড়ে তুলেছিল। অতীতে যে মাটিতে কোনো মানুষের পা পড়েনি সে মাটি তারা বাসযোগ্য করে তুলেছিল। আর তাতে ফলিয়েছিল ধান, ভুট্রাসহ নানা ধরনের সবজি। সুখে ছিল তারা। সে জগতে মহাজন, দালাল বা জমিদার ছিলনা। কেহ ঋণী ছিল না। নিজস্ব বিচার ও সামাজিক ব্যবস্থায় চলত তাদের সমাজ ব্যবস্থা। জমিতে চাষযোগ্য করার পর তার উপর নজর পড়ল ব্যবসায়ী ও মহাজনদের। তারা দলে দলে আসতে শুরু করল সাঁওতাল পরগনায়। তারা সাঁওতাল পরগনা থেকে বিপুল পরিমাণ ধান, সরিষা ও অন্যান্য তৈলবিজ গরুর গাড়ি বোঝাই করে নিয়ে যেতে লাগল। তার বিনিময়ে সাঁওতালদের দেওয়া হতো সামান্য লবণ, টাকা-পয়সা, তামাক কিংবা কাপড়। এখানে বিনিময়ের সময় চরমভাবে ঠকানো হতো সাঁওতালদের। কিছু অর্থ বা অন্যকোন সামান্য দ্রব্য ঋণ হিসাবে দিয়ে সাঁওতালদের আজীবন ভাগ্য বিধাতা ও কর্তা হয়ে বসত মহাজনরা। ফসল কাটার সময় হলে মহাজনরা গরুর গাড়ি ও ঘোড়া নিয়ে সাঁওতাল পরগনায় আসত। বার্ষিক আদায়ে আসার সময় মহাজনরা একটি পাথরে সিঁদুর মাখিয়ে নিয়ে আসত এবং সাঁওতালদের বলত, এ পাথরের ওজন নির্ভূল। এ পাথর দিয়ে ওজন করে মহাজনরা সাঁওতালদের সব ফসল তুলে নিয়ে যেত। কিন্তু তারপরও আদিবাসীদের ঋণের বোঝা সামান্য কমত না। বরং তা দিন দিন বেড়ে যেত। ঋণের সুদের হার অতি উচ্চ হওয়ায় একজন সাঁওতালকে ঋণ পরিশোধের জন্য জমির ফসল, চাষের বলদ, নিজেকে এমনকি তার পরিবারকে হারাতে হতো। ঋণের ১০গুণ শোধ করলেও তা আগের মতোই অবশিষ্ট থাকত।নিরীহ ও সরল আদিবাসীদের শোষণ ও নির্যাতনে মহাজন, দালাল ও জমিদারদের পরোক্ষ মদদ দিতো ব্রিটিশ সৈন্য বাহিনী। এ কারণে আদিবাসীরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। ১৮৫৫ সালের ৩০জুন যুদ্ধ শুরু হয় এবং ১৮৫৬ সালের নভেম্বর মাসে তা শেষ হয়। সাঁওতালরা তীর-ধনুক ও দেশীয় অস্ত্র-সস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করলেও ইংরেজ বাহিনীর হাতে ছিল বন্দুক ও কামান। তারা যুদ্ধে হাতি ও ঘোড়া ব্যবহার করেছিল। এ যুদ্ধে ইংরেজ সৈন্যসহ প্রায় ১০হাজার সাঁওতাল যোদ্ধা মারা যায়। সাঁওতাল বিদ্রোহের লেলিহান শিখা ব্রিটিশ সরকারের মসনদ কাঁপিয়ে দিয়েছিল। যুদ্ধে বিদ্রোহের মহানায়ক চার ভাই সিদ-কানহু-চান্দ ও ভাইরব পর্যায়ক্রমে নিহত হলে ১৮৫৬ সালের নভেম্বর মাসে যুদ্ধ শেষ হয়।ইতিহাসবিদদের মতে, সাঁওতাল জাতির ইতিহাসে সিদ-কানহু-চান্দ ও ভাইরবের নেতৃত্বে সংগঠিত সাঁওতাল বিদ্রোহই ছিল বৃহত্তম ও গৌরবের বিষয়। তাদের এই বিদ্রোহ ভারতবর্ষে স্বাধীনতার বীজ বপন করে দিয়েছিল। এই বিদ্রোহের ফলাফল হলো, ইংরেজ সরকার সাঁওতালদের অভিযোগ বিষয়ে তদন্তের ব্যবস্থা করল। ম্যাজিস্ট্রেট এডন সাঁওতালদের অভিযোগ শুনলেন। যুদ্ধের পর সাঁওতালদের সমস্যা বিবেচনা করে তাদের জন্য দুমকা জেলা বরাদ্দ করা হলো। এটাই সাঁওতাল পরগনা নামে পরিচিত। এখানে সাঁওতালরা শাসন পরিচালনার জন্য দারোগা, পুলিশ ও বিভিন্ন সরকারি ক্ষমতা প্রাপ্ত হলো। সাঁওতালদের বিচার সালিস তাদের আইনে করার জন্য সরকার ক্ষমতা দিলো। খাজনা, কর প্রভৃতি তাদের হাতে ন্যস্ত করা হলো। এবার বাংলাদেশের আদিবাসী প্রসঙ্গে আসা যাক। সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও অনুমান করা হয় যে, বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চল ও সমতলে ৪৫টি আলাদা জাতিগোষ্ঠীর ২৫ লক্ষাধিক আদিবাসীর বাস। আজ থেকে ১৬০ বছর আগে আদিবাসীরা যে সকল অভিযোগে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল এখনও বাংলাদেশের আদিবাসীদের একই ধরনের অভিযোগে রাস্তায় নামতে হচ্ছে। এখনও আদিবাসীদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মেলেনি বরং নৃ-তাত্বিক জনগোষ্ঠী নাম দিয়ে রাষ্ট্র তাদের দূরে ঠেলে দিয়েছে। এখনও বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আদিবাসীদের জমিজমা থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। নির্যাতনের মাধ্যমে এলাকা থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। বাংলাদেশের নাগরিক হলেও আদিবাসীরা আজ ছায়া নাগরিকে পরিণত হয়েছে। বর্তমান তদবিরবাজ ও চাটুকার সমাজ ব্যবস্থার সাথে খাপ খেয়ে চলতে না পারায় তারা সকল ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে আছে। ভাষাগত সমস্যার কারণে আদিবাসীরা শিক্ষায় পিছিয়ে থাকলেও তাদের শিশুদের জন্য নিজ ভাষায় শিক্ষা প্রদানের বিষয়টি এখনও রাষ্ট্র চালু করতে পারেনি। আধুনিক চিকিৎসা সেবা হতে আদিবাসীরা আজও অনেক দূরে অবস্থান করছে। আদিবাসীদের ভূমি হারানো রোধে আইন থাকলে আজও বিভিন্ন কৌশলে তাদের জমি জমা হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। বছরের অধিকাংশ সময় আদিবাসীরা কর্মহীন থাকায় গ্রাম্য মহাজন ও দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ গ্রহণ বা আগাম শ্রম বিক্রয় করে আজও তাদের জীবণ অতিবাহিত করতে হচ্ছে। এ বিষয়ে রাষ্ট্র এখনও কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেনি। মহান মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসীরা বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করলেও আজও তাদের স্বীকৃতি মিলেনি। তাইতো স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরও বাংলাদেশের আদিবাসীরা সমাজের তলানিতে পড়ে আছে।আমার জানা মতে, ২০০৫ সাল থেকে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে সান্তাল হুল বিভিন্ন বেসরকারি ও আদিবাসী সংগঠনের উদ্যোগে উদ্যাপিত হয়ে আসছে। এ বছর সারাদেশের আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় এই দিবসটি উদ্যাপিত হবে। তবে শুধু দিবস উদ্যাপন করে আদিবাসীদের বসে থাকলে চলবে না। সান্তাল হুলের ১৬০ তম বার্ষিক থেকে শিক্ষা নিয়ে অধিকার প্রতিষ্ঠা ও দাবি আদায়ের জন্য তাদের এগিয়ে যেতে হবে।