সংযম ও সহমর্মিতার মাস পবিত্র রমজান

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেছেন, হে মুমিনগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেভাবে ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যাতে করে তোমরা মুত্তাকি এবং সংজমী হতে পারো (সুরা বাকারাহ)। পবিত্র রমজান মাস সংযমের মাস। রমজান মাস মানুষকে সংযম হতে শিক্ষা দেয়। পবিত্র রমজান মাসের আগমনে মুনাফিক বন্দার হৃদয় সংযমী হয়। আত্মসংযমে পুলকিত হয় হৃদয়-আত্মা। গোটা পরিবার পরিবেশব্যাপী স্বর্গীয় শান্তি ও সংযমের বার্তা নামে। আমলি হয়ে উঠে মানবাত্মা। আল্লাহ তা’য়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে সব ধরনের গুনাহ, ঠকাবাজিসহ সব ধরনের খারাপ কাজ এবং কাজের চিন্তা ভাবনা ও মানসিকতা ত্যাগ করা উচিত এমাসে। সব ধরনের লোভ লালসা থেকে সংযমী হওয়া উচিত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ মহান রোজার হুকুম প্রদানের উদ্দেশ্যে বর্ণনা করতে গিয়ে স্পষ্টভাবে বলেছেন, আমি তোমাদের সংযমী হওয়ার জন্য রোজার আহকাম ফরজ করেছি। সুতারাং একথা অপকটে স্বীকার করতে হবে যে সংযম অবলস্বন করা বা সংযমী হওয়া রমজানের মৌলিক শিক্ষার অন্যতম। পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে সংযম অবলম্বনের পরলৌকিক ও ইহলৌকিক সফলতা নিহিত রয়েছে । রয়েছে সামাজিক বিভিন্ন উপকারিতা। তাই আমাদের উচিত, অন্যান্য মাসে যে সব কাজ খুব সহজে এবং হালকা মনে করি অথবা নিজেদের অথবা নিজেদের অভ্যাস হিসেবে পালন করি, পবিত্র রমজান মাসে সেসব কাজ থেকেও বিরত থাকা উচিত। আর এই বিরত থাকাই সংযম।
সংযম বলতে কি বোঝায়: সংযম শব্দের ব্যাখ্যা হলো বিরত থাকা বা সংবরণ করা। সব ধরণের অন্যায় ও অনৈতিক কর্মকান্ড থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি সাধারণ সময় অভ্যাস ছিল এমন বিভিন্ন কর্মকান্ডকে ত্যাগ করাই সংযমের তাৎপর্য বা ব্যাখ্যা। ঈমাম ইবনে হাম্মাম আল-সাউদ সংযমের ব্যাখ্যা প্রদান করতে গিয়ে বলেছেন, সাধারণ সময় যেসব কাজ একজন মানুষ অভ্যাসে, হালকা মনে করে, বিনোদন বা মনোরঞ্জনের জন্য বা আরো বিভিন্ন উদ্দেশ্য করে থাকে এমন সব কাজকে ত্যাগ করাকেই মূলত সংযম বলা হয়। অন্যত্র আল্লামা কাজী ছানা উল্লাহ পানিপথি (রহঃ) বলেছেন, সব ধরণের খারাপ কাজ বা অভ্যাস ত্যাগ করার নামই কেবল সংযম নয়, সংযমী হওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো এমাসে আল্লাহ মহানের সব আদেশ নিষেধ হুবহু মান্য করা এবং আত্মিক শক্তির উন্নয়ন সাধন করা। মানুষের জীবনে পানাহার ও স্ত্রী সম্ভোগ এই তিনটি চাহিদা খুবই গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা। মানব জীবনে গতি স্থিতিশীলতা নির্ভর করে মানুষের এসব চাহিদার উপর। আর এই তিনটি চাহিদার প্রতি রয়েছে মানুষের ব্যাপক আকর্ষণ বা আসক্তি পবিত্র রমজান উপলক্ষে এ তিনটি চাহিদা সুনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যাবহার করার নামই সংযম বা সংযমী হওয়া। রোজার দিনে সংযমের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কতক আলেম ওলেমা বলেছেন, সুপ্রবৃত্তি এবং কুপ্রবৃত্তি দুটি স্বভাবে সমন্বয়ে গঠিত মানবাত্মা। মানবাত্মা এই দুটি স্বভাবের সুশীল সঠিক ব্যবহার বা নিয়ন্ত্রন করাকে সংযম বলা হয়। আর্থাৎ সুপ্রবৃত্তির উন্নয়ন বিকাশ এবং উৎকর্ষ সাধন করা আর কুপ্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ ও পরত্যাগ করণ প্রক্রিয়া সংযম থাকা বা সংযমী হওয়া বলা হয়।
রমজানে কেন সংযমী হবঃ পবিত্র রমজানের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয় সংযম অবলম্বন করা বা সংযমী। পবিত্র কোরআনে যাকে মুত্তাকি হওয়া বলে প্রকাশ করা হয়েছে, সংযমহীন রোজা পালন একেবারেই অর্থহীন। এককথায় বলতে গেলে, সংযমহীম রোজা পালন পরলৌকিক প্রতিদানের প্রতিশ্রুতির আওতাভুক্ত নয়। আল্লাহ তা’য়ালার দরবারে এরকমের রোজার কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। কারণ রমজানের রোজা ফরজ করার কথা বলতে গিয়ে আল্লাহ মহান স্পষ্টভাবে বলেছেন, আর এই রোজা এজন্যযে যাতে করে সংযমী হতে পারো তোমরা। সুতারাং রোজা যে জন্য ফরজ করা হয়েছে তা ঠিক না থাকলে রোজা ফরজ করার মূল উদ্দেশ্য বিঘিœত হবে। আর কোনো আমলে মূল উদ্দেশ্য যখন বিঘিœত হয়, তখন সে আমলের প্রতিদান প্রদান প্রতিশ্রুতি বিঘিœত হওয়াই স্বাভাবিক। এজন্য আমাদের উচিত, পবিত্র রমজান মাসের রোজা পালনের মূল উদ্দেশ্য জেনে সংযমের সঙ্গে রোজা পালন করা।
সংযমের প্রশিক্ষণঃ এই মাস সংযমের প্রশিক্ষণের মাস। খাবার চাহিদা, পান করার চাহিদা, যৌন চাহিদাসহ মানুষের নানা চাহিদা বা আবেদনকে সুনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহার করার শিক্ষা প্রদান করে পবিত্র এই মাস। পরিমিত খাবার গ্রহণ, নির্দিষ্ট পরিমাণ বিশ্রাম এবং রুটিন মতো জীবন-যাপন করার উত্তম প্রশিক্ষনই এই রমজান। মানুষের যে কোনো প্রকার চাহিদাকেই এই মাসে সংযমের দৃষ্টিতে দেখতে ও পালন করতে আদেশ প্রদান করা হয়েছে এবং এই সংযমের আদেশ কেবল এই একটি মাসের সীমায় সীমাদ্ধ নয়। এই একমাস সংযমের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে বাকী এগার মাস সে সংযমের প্রয়োগ ঘটাতে হবে।
সহমর্মিতার মাস রমজানঃ একাধারে সহমর্মিতার অনন্য সময় পবিত্র রমজান। এসময় কোনো রোজাদারকে ইফতার করানো বা অন্য কোনো উপায়ে সাহায্য-সহযোগীতা করাকে আল্লাহ মহান অন্য সময়ের তুলনায় অধিক সওয়াব প্রদান করার প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছেন। রমজান মাস ছাড়া অন্য কোনো সময় একজন অসহায় ব্যক্তিকে সাহায্য করার মাধ্যমে যে সওয়াব অর্জিত হয়, রমজান মাসে সে সওয়াব সত্তরগুন বেশি হয়। এই জন্যই রমজান মাসকে সহমর্মিতার স্বর্ণ প্রহর বলা হয়ে থাকে। তাই আমাদের উচিত, এই মাসে অন্যদের সাহায্য-সহযোগীতা বেশি করা দরকার। আবার এই ভাবে অন্য সময় সাহায্য-সহযোগীতা এক সংঙ্গে করবো। যখন যে পরিমাণ সম্ভব হবে। তখন সে পরিমাণ ভাল কাজ করা উচিত।