এখনই নিন রোজার স্বাস্থ্যগত প্রস্তুতি

পেপটিক আলসার বা অ্যাসিডিটি
খালি পেটে থাকলে অ্যাসিডিটির সমস্যা বাড়বে— অনেকের ভাবনা এ রকম। তাই রোজা হলে এ ধরনের রোগীরা দুশ্চিন্তায় পড়ে যান রোজা রাখবেন কি না। রোজা রাখলে অ্যাসিডিটি বাড়বে, এমন কোনো সম্ভাবনা নেই। পেপটিক আলসারের রোগীদের প্রধান কাজ হল নিয়মিত খাবার খাওয়া, নিয়মিত ঘুমানো এবং নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ। রোজায় মানুষের জীবন একটা নিয়মে চলে আসে বিধায় এ সময় অ্যাসিডিটির সমস্যা অনেকাংশে কমে যায়। কেউ যদি ভয় পেয়ে যান এই ভেবে যে, রোজায় তার অ্যাসিডিটির সমস্যা বেড়ে যেতে পারে, তাহলে তিনি সেহরি ও ইফতারের সময় রেনিটিডিন বা ওমিপ্রাজল গ্রুপের ওষুধ একটি করে খেয়ে নিতে পারেন। পাশাপাশি অবশ্যই ভাজাপোড়া জাতীয় খাবার পরিহার করতে হবে। এখন অনেক ওষুধ আছে যেগুলো অ্যাসিডিটি নিয়ন্ত্রণের জন্য দৈনিক একবার খেলেই চলে।

উচ্চ রক্তচাপ
উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের বেলায়ও একই ব্যবস্থা অবলম্বন করা যায়। তবে কথা হচ্ছে, এক্ষেত্রে ওষুধ পরিবর্তন করার সময় অবশ্যই

নিয়মিত চিকিত্সকের তত্ত্বাবধানে থাকতে হবে। কারণ ওষুধ পরিবর্তনের ফলে রক্তচাপ খুব সহজে নিয়ন্ত্রণে নাও আসতে পারে। তাই উচ্চ রক্তচাপের রোগী যারা নিয়মিত বিভিন্ন ধরনের ওষুধ খেয়ে রক্তচাপকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন তারা যদি রোজা রাখার জন্য নতুন শিডিউলে ওষুধ গ্রহণ করতে চান সেক্ষেত্রে সপ্তাহখানেক আগে থেকে নতুন শিডিউলের ওষুধ গ্রহণ করে ট্রায়াল দিতে হবে। ট্রায়ালে যদি দেখা যায়, নতুন ওষুধে সহজেই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে তাহলে রোজা রাখা সহজ হবে।

ডায়াবেটিস
ডায়াবেটিক রোগীদের ক্ষেত্রেও অবলম্বন করতে হবে একই রকম সতর্কতা। যেসব ডায়াবেটিক রোগী বিশেষ খাবার এবং ব্যায়ামের মাধ্যমে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন তাদের জন্য রোজা রাখা খুব সহজ ও উপকারী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব রমাদান ফাস্টিং রিসার্চ’ জার্নালে প্রকাশিত নিবন্ধে। তবে যারা মুখে ওষুধ গ্রহণের মাধ্যমে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখছেন তারাও চিকিত্সকের পরামর্শ অনুযায়ী রোজা রাখতে পারবেন, তবে ব্যায়াম করার ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে যাতে করে ব্যায়ামের ধকল বেশি হয়ে না যায়।

আর ইনসুলিন গ্রহণকারী রোগীরাও রোজা রাখতে পারবেন, তবে এ ক্ষেত্রে অবশ্যই চিকিত্সকের পরামর্শক্রমে  ব্যবস্থা নিতে হবে। রমজানে ডায়াবেটিক রোগীদের রক্তে সুগারের মাত্রা হঠাৎ কমে গেলে বা হঠাত্ করে অজ্ঞান হয়ে পড়লে রোজার কথা চিন্তা না করে দ্রুত এক গ্লাস শরবত খাইয়ে দিন। সেহরির সময় রুটি খাওয়া বেশ ভালো। কেননা তা দীর্ঘ সময় পেটে থাকায় রক্তের গ্লুকোজ হঠাৎ করে কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে না।

কিডনি রোগ
কিডনি রোগ হলেই রোজা রাখা যাবে না, এমন কোনো কথা নেই। তবে এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কিডনি ফেইলিউর রোগীদের সুনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করতে হয়, নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়, এমনকি পানি খাওয়ার ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ প্রয়োগ করা হয়। তাই রোজা রাখার ক্ষেত্রে তাদের বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। আশার কথা হল, ইরান, লিবিয়া ও সৌদি আরবে কিডনি রোগীদের ওপর পরিচালিত এক বৈজ্ঞানিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, অল্প থেকে মধ্যম মাত্রার কিডনি ফেইলিউর রোগীরা রোজা রাখলে কোনো ক্ষতি হয় না। সামান্য যা হয়, রোজার মাস শেষ হয়ে গেলে ১৫ দিনের মধ্যেই তা আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে যায়। তবে যাদের কিডনি ফেইলিউরের মাত্রা একেবারে শেষ পর্যায়ে, তাদের পক্ষে রোজা রাখা সম্ভব নয়। তেমনি যারা ডায়ালাইসিসের রোগী অথবা ইতোমধ্যে কিডনি প্রতিস্থাপন করেছেন, ঘড়ির কাঁটা দেখে ওষুধ খেতে হয় বলে তাদের পক্ষেও রোজা রাখা প্রায় অসম্ভব। তবে শারীরিক অবস্থা যা-ই থাকুক না কেন, সর্বাবস্থায় আপনার চিকিত্সকের পরামর্শ নিয়ে রোজা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়াই শ্রেয়।

গর্ভকালীন রোজা
গর্ভবতী মায়ের যদি শারীরিক কোনো জটিলতা না থাকে তাহলে রোজা থাকতে কোনো বাধা নেই। রোজা রাখা যাবে কি যাবে না এটা নির্ভর করে রোগীর ওপর। প্রয়োজনে এ বিষয়ে রোজার মাস আসার আগেই আপনার ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

অ্যাজমা বা শ্বাসকষ্টের রোগী
রোগ নিয়ন্ত্রণে থাকলে অ্যাজমা বা শ্বাসকষ্টের রোগীদের রোজা রাখতে কোনো বাধা নেই। রোজা রাখা অবস্থায় ইনহেলার নেওয়া যাবে কি না, এ ব্যাপারে সারাবিশ্বের ইসলামী চিন্তাবিদরা যে মতামত দিয়েছেন তাতে রোজা রাখা অবস্থায় ইনহেলার নিলে রোজার ক্ষতি হওয়ার কথা বলা হয়নি। তবে সঠিক নিয়মে ইনহেলার নিলে রক্তে ওষুধ মিশতে পারে না বা নগণ্য পরিমাণ মিশতে পারে।

তবে শেষ কথা হচ্ছে, রোজা রাখার জন্য রোগব্যাধি সবসময়ে বাধা নয়। রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য আপনি নিয়মিতভাবে যে চিকিত্সকের তত্ত্বাবধানে আছেন, রোজা রাখার প্রস্তুতি হিসেবে প্রথমে তার সঙ্গেই কথা বলতে হবে। মনে রাখতে হবে, সাধারণভাবে রোজা শরীরের জন্য উপকারী, কাজেই এ বিষয়ে আগ্রহ থাকাটাই বাঞ্ছনীয়।

বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন এমন মা
অনেকে মনে করেন, রোজা রাখলে বুকের দুধ কমে যায়। ফলে সন্তান দুধ থেকে বঞ্চিত হয়। বিষয়টি একদম ভুল। কেননা রোজা রাখলে বুকের দুধ কমার কোনো আশঙ্কা নেই। এ ক্ষেত্রে আপনাকে অবশ্যই সেহরি ও ইফতারের সময় প্রচুর তরল খাবার খেতে হবে। ইফতারের পর শোয়া পর্যন্ত ঘণ্টায় ঘণ্টায় অল্প অল্প করে পানি খেতে হবে।