খুলনায় স্কুলছাত্রীর পায়ে ঠিকাদারের গুলি, ফাঁসিয়েছেন চার যুবককে!

খুলনা মহানগরীর মিস্ত্রিপাড়ায় ঠিকাদার শেখ ইউসুফ আলীর গুলিবর্ষণের পেছনে রয়েছে অন্য কাহিনী। মেয়ের প্রেমিক ও প্রেমিকের তিন বন্ধু তার বাড়িতে গেলে ক্ষিপ্ত হয়ে গুলি ছুড়েছিলেন ঠিকাদার শেখ ইউসুফ আলী। ওই গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েই স্কুলছাত্রী লামিয়ার (১৫) বাম পায়ে বিদ্ধ হলে সে এখন খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

আজ সোমবার সকাল পর্যন্ত খুমেক হাসপাতালে লামিয়ার অস্ত্রোপচার করা হয়নি। লামিয়ার নানা বলেন, ‘ব্যথার যন্ত্রণায় ছটফট করছে। এখনও তার পায়ের গুলি বের করা হয়নি। আমরা খুবই চিন্তায় রয়েছি।’
চিকিৎসকরা বলছেন, লামিয়ার থ্রি-ডি সিটি স্ক্যান এবং হাই আল্ট্রাসনোগ্রাম পরীক্ষা করা হয়েছে। রিপোর্ট পাওয়ার পর সিদ্ধান্ত হবে খুলনায় অপারেশন হবে কি-না? গুলির অবস্থান নির্ণয় করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
ঠিকাদার ইউসুফের করা মামলায় ইতোমধ্যেই গ্রেপ্তার হয়েছেন ওই চার যুবক। তারা হলেন, যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার মো. মোস্তফা বিশ্বাসের ছেলে মোহাম্মদ আবু সাঈদ ওরফে শাহেদ (২২), বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলার মল্লিক আব্দুল হাইয়ের ছেলে মো. ইসমাইল মল্লিক (২৭), খুলনা জেলার কয়রা উপজেলার শেখ হাবিবুর রহমানের ছেলে মো. মেহেদী হাসান (২১) ও দৌলতপুর থানার ৬নং ওয়ার্ডের মো. মিজানুর রহমান শেখের ছেলে মো. সাইফুল ইসলাম (২৩) ।
তবে মামলায় ওই যুবকদের চাঁদাবাজ ও দুস্কৃতকারী হিসেবে উল্লেখ করে মামলাটি করেছিলেন ঠিকাদার ইউসুফ আলী। তার মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, মিস্ত্রিপাড়া আরাফাত জামে মসজিদের পাশের বাবু খান রোডের সংস্কারের কাজ পেয়েছেন তিনি। কিছু দুষ্কৃতকারী এ কাজটির জন্য তাকে চাপ দিচ্ছিলেন। দুষ্কৃতকারীরা কাজটা কিনতে চান। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তারা চাঁদা চাইতে বাড়িতে গেলে লাইসেন্স করা বন্দুক দিয়ে তিনি গুলি ছোড়েন।

কিন্তু অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঠিকাদার শেখ ইউসুফ আলীই গুলি করেন। বাড়িতে যাওয়া ওই যুবকদের কাছে কোনো অস্ত্রই ছিলো না। তারা কোনো চাঁদাবাজ বা দুস্কৃতকারী নন, ঠিকাদারের মেয়ের প্রেমিক ও তার তিন বন্ধু। তাদের পরিচয় পেয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে হুমকি দেন ঠিকাদার শেখ ইউসুফ আলী। পরিস্থিতি খারাপ হবে বুঝে বাড়ির লোকেরা তাদের বের হয়ে যেতে বলেন। তারা বের হতে না হতেই পিস্তল হাতে বেরিয়ে পড়েন ঠিকাদার। তখনই তিনি তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন।
গুলির শব্দ শুনে পাশের বাড়ির স্কুলপড়ুয়া লামিয়া কৌতুহলবশত ঠিকাদারের বাড়ির সামনে যায়। ঠিক সেই সময় একটি গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে বিদ্ধ হয় শিশু লামিয়ার বাম পায়ে।

ঠিকাদারের করা মামলা ও দাবি করা সব তথ্য মিথ্যা বলে অভিযোগ করে ওই চার যুবকের স্বজনেরা বলেন, ঠিকাদার ইউসুফ আলীর মেয়ে রুকাইয়া বানরগাতির সোহরাওয়ার্দী কলেজে পড়েন। ঠিকাদার মেয়ের বিয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। মেয়ের মোবাইল ফোনও কেড়ে নিয়েছিলেন তিনি। রুকাইয়ার সঙ্গে শাহেদ নামে ছেলেটির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। কয়েকদিন মোবাইল ফোন বন্ধ পেয়ে প্রেমিক শাহেদ তার তিন বন্ধু মেহেদি, ইসমাইল ও সাইফুলকে নিয়ে যান ইউসুফ আলীর বাড়িতে। তারা রুকাইয়া ও শাহেদের দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্কের কথা বলতেই ইউসুফ আলী ক্ষিপ্ত হয়ে প্রথমে তাদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকেন। তখন সেখানে উপস্থিত রুকাইয়ার মামা তাদের বের হয়ে যেতে পরামর্শ দেন। তারা বের হয়ে দরজা পর্যন্ত আসার পরে ইউসুফ পিস্তল নিয়ে বের হয়ে গুলি ছোড়েন।

এ ঘটনা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে ঘটনাটি ভিন্ন খাতে নিতে ঠিকাদার মেয়ের প্রেমিক ও প্রেমিকের বন্ধুদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলা করেছেন বলেও অভিযোগ স্বজনদের।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার কানাই লাল সরকার জানান, ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার করে খুলনা বিভাগের বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করে আসামি চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আসল রহস্য উদঘাটনে ঘটনাটির আরও তদন্ত করা হবে বলেও জানান তিনি।