শেখ হাসিনাকে সতর্ক হতে হবে

আমরা জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীর বছর অতিক্রম করেছি। মাত্র একদিন আগে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের পঞ্চাশতম বার্ষিকী পালন করেছি। এ বছর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছি। মনে হতে পারে, বাংলাদেশ জোয়ারের স্রোতে পালতোলা নৌকার মতো তরতর করে এগিয়ে চলছে। কোনো বাধা-বিঘ্নই নেই তার সামনে। এমনটি হলে আমাদের আনন্দের সীমা থাকত না। কিন্তু আমাদের জাতীয় জীবনের চরম আনন্দের বছরগুলোই বাস্তবে ঢাকা পড়ে গেছে নানা বিপদ, সংকট ও চক্রান্তের মেঘের আড়ালে। এ কালো মেঘের আড়াল থেকে আমাদের জীবন বের হয়ে এসে শান্তি ও সমৃদ্ধির দিকে আরও দ্রুতগতিতে এগোতে পারবে কিনা সেটাই এখন প্রশ্ন।

এ কথা অনস্বীকার্য, আওয়ামী লীগের চলতি তিন মেয়াদের শাসনামলে আমাদের অর্জন অনেক। সেটি ঢাকা শহরের দিকে তাকালেও বোঝা যায়। যমুনা, পদ্মা ব্রিজ আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতির প্রতীক। বন্যার দেশে নদীশাসন চলছে। নারী শিক্ষা সুবিস্তৃত হয়েছে। শিল্পোন্নয়ন ও কলকারখানা স্থাপনে দেশ এগিয়ে চলেছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রশংসা করছে সব দেশ।

কিন্তু কে জানত, আমাদের মহাপ্রতীক্ষিত, জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীর বছরটিতেই কোভিড-১৯-এর মতো বিশ্বগ্রাসী মহামারির আবির্ভাব ঘটবে? লক্ষ লক্ষ লোকের মৃত্যু ঘটতে থাকবে। মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের স্বাধীনচেতা বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী। অবশিষ্ট যারা ছিলেন তাদের অনেককে হরণ করেছে করোনাভাইরাস। এটা ছিল বিশ্বব্যাপী অপ্রতিরোধ্য এক মহামারি। এ মহামারি প্রতিরোধে আওয়ামী লীগ সরকার প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখেছে এবং বিশ্বে প্রশংসা অর্জন করেছে।

এই সাফল্য যদি সরকার দুর্নীতি দমন ও সামাজিক অবক্ষয় রোধে দেখাতে পারত, তাহলে আজ এ প্রশ্ন উঠত না। দেশ কোন পথে ছুটছে? সমৃদ্ধির সঙ্গে সর্বনাশের দিকেও কি? সত্যই বাংলাদেশের জন্য এটা একটি ভয়ংকর কথা। দেশের এত উন্নতি, দেশের মানুষের এত সমৃদ্ধি, তবু সামাজিক অবক্ষয় এবং রাজনৈতিক চক্রান্ত যেন দেশটাকে সুস্থির হতে দিচ্ছে না। দেশের তারুণ্যের অধোগতি, সামাজিক মূল্যবোধের দ্রুত অবক্ষয় আমাদের অর্থনৈতিক উন্নতিকে যেন গ্রাস করতে চলেছে।

আইন শক্ত করে এ অবক্ষয় রোধ করা যায় না। এটা রোধ করতে পারে সংগঠিত ও সচেতন রাজনৈতিক দল। আওয়ামী লীগ ছিল এক সময় এ ধরনের দল। কিন্তু আজ আওয়ামী লীগ নিজেই সংগঠিত ও সচেতন দল নয়। দুর্নীতিবাজ-নব্যধনীদের একটি বড় অংশ শাসকদলে ঢুকে পড়েছে। রাজনৈতিক দল হিসাবে আওয়ামী লীগ যত দুর্বল হচ্ছে, সরকার ততই আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এ আমলাতন্ত্র আবার সরকারকে সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতার পথে টেনে নিয়ে চলেছে।

সরকার তো দুর্নীতি দমনের জন্য বহু ঢাকঢোল পিটিয়ে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছিল। তাতে ধরা পড়েছিলেন কারা? আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের মহারথীরাই। করোনার অজুহাতে এ শুদ্ধি অভিযান এখন সম্ভবত স্থগিত। করোনার পর দুর্নীতি ও ধর্মব্যবসা আজ আমাদের জাতীয় জীবনের দুটি মহাশত্রু। এ দুই শত্রুকে দমন করতে হবে। তা নাহলে উইপোকা যেমন করে সবকিছু ধ্বংস করে, তেমনি এ দুর্নীতি ও ধর্মান্ধতা আমাদের সামাজিক জীবনের অগ্রগতি ও আধুনিকতার গতিরোধ করে তাকে পশ্চাৎমুখী করবে। দুর্নীতি ইতোমধ্যেই আমাদের সামাজিক জীবনের প্রতিস্তরে ক্ষয় ধরিয়েছে, আরও ধরাবে।

কোনো আদর্শবোধ ও নীতি দ্বারা চালিত না হওয়ায় আমাদের শিক্ষিত তরুণ সমাজে পর্যন্ত দ্রুত অধঃপতন বিশেষভাবে লক্ষণীয়। আগে যে ছাত্রসমাজ পরিচিত ছিল সমাজের অগ্রসর শ্রেণি হিসাবে এবং যারা যে কোনো সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিত, তাদের একটি বড় অংশ আজ সন্ত্রাস, পারমিটবাজি, নারী ধর্ষণ ইত্যাদি অপরাধে লিপ্ত। জামায়াত এখন তাদের বেশিরভাগ ক্যাডার সংগ্রহ করে মাদ্রাসার ছাত্রদের ভেতর থেকে নয়, উচ্চ শিক্ষিত তরুণ-তথা কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিত ও ধনী শ্রেণির ছাত্রদের মধ্য থেকে।

নারী ধর্ষণের জন্য মৃত্যুদণ্ড প্রদান করার আইন করেও নারী ও শিশু নির্যাতন হ্রাস করা যায়নি। বরং তা বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে মাদ্রাসাছাত্রীরাই নির্যাতিত হচ্ছে বেশি। কোনো কোনো মাদ্রাসায় শিক্ষকরাই তাদের ছাত্রীদের ধর্ষণের শিকার করেন। ঢাকার খবরের কাগজে দেখলাম, একদিনে তিনটি ধর্ষণ অথবা ধর্ষণচষ্টার খবর। সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার মোগলাবাজার এলাকার তুরুখখোলা ইসলামিয়া বালিকা মাদ্রাসার চৌদ্দ বছর বয়সের নবম শ্রেণির এক ছাত্রীকে রাস্তায় পেয়ে অপহরণ করে ৮ ব্যক্তি পালাক্রমে ধর্ষণ করেছে।

নবীগঞ্জে বাসের ভেতরে কলেজছাত্রীর শ্লীলতাহানির চেষ্টা করা হয়। ছাত্রীটি বাস থেকে লাফ দিয়ে পড়ে সম্মান বাঁচায়। মৌলভীবাজারের হাওর এলাকায় এক কিশোরীকে গণধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। রাজধানী শহরেই যেখানে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা ধর্ষণের কবল থেকে নিরাপদ নয়, সেখানে শহর থেকে দূরে গ্রামাঞ্চলে নিত্যনিয়ত কী ঘটছে, তার খবর এই সংবাদ প্রবাহের যুগেও কে রাখে!

দেশের সামাজিক অবক্ষয় ও ‘মুম্বাইয়া’ অপসংস্কৃতির দ্রুত প্রভাব বৃদ্ধির কথা আমার বহু লেখাতেই লিখেছি। বাংলাভাষা ও সংস্কৃতির বিকৃতি ঘটানো কত দ্রুত চলছে, সে কথাও লিখেছি। এ সম্পর্কে যথাসময়ে সচেতন না হলে দেশের চরম সর্বনাশ হবে। বঙ্গবন্ধু এ সর্বনাশ ঠেকানোর জন্য বারবার বলেছেন, আমি প্রথমে বাঙালি, তারপর মুসলমান। ইসলামের নবীও (সা.) তার পরিচয়পত্রে লিখতেন, মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ আল মাক্কি, আল আরাবি। অর্থাৎ তিনি মক্কার লোক এবং জাতিতে আরব এটাই ছিল তার প্রধান পরিচয়। নবী আরও নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘স্বদেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ’।

মৌলবাদীরা এসব কথা চেপে রাখেন। যে বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে স্থাপিত, সেই দেশে বাঙালি নয়, আগে মুসলমান পরিচয়ে চিহ্নিত হওয়ার জন্য প্রায় সবাই অতি আগ্রহী। আওয়ামী লীগের নেতারাও। ভোটদাতাদের নিজেদের মুসলমান প্রমাণের জন্য তারা জামায়াতিদের চেহারা অনুকরণে ব্যস্ত।

পাকিস্তান আমলে কমিউনিস্ট পার্টির একদল নেতা মুসলমান নাম গ্রহণ এবং দাড়ি রাখা, টুপি ব্যবহার শুরু করেছিলেন। তারা ভেবেছিলেন, এভাবে পরিচয় বদল করে মুসলমান জনগণের মধ্যে মিশে যাবেন। তাদের সমর্থন অর্জন করবেন। এ চালাকির ফল কী দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের আজকের রাজনীতিতে কমিউনিস্ট পার্টির (চীন এবং রাশিয়া দুই অংশেরই) বর্তমান অবস্থা তার প্রমাণ। আওয়ামী লীগ এ ব্যাপারে কমিউনিস্ট পার্টি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে কি?

সৈয়দ মুজতবা আলী লিখেছিলেন, ‘চালাকি দ্বারা কোনো মহৎ কাজ হয় না’। বাংলাদেশের রাজনীতিতেও ‘চালাকির মুসলমান’ সেজে কমিউনিস্ট পার্টি যেমন লাভবান হয়নি, তেমনি অন্য কোনো দলও হবে না। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে সরকারের পতন ঘটানোর জন্য আন্দোলনের বিধান আছে। কিন্তু চক্রান্তের বিধান নেই। বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটার পর একটা চক্রান্ত যেন ঘটেই চলেছে। লন্ডন থেকে ‘অহি’ পাঠিয়ে এক দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি রাজনৈতিক দল চালাচ্ছে, এটাও একটি বিরল ঘটনা। শাসক রাজনৈতিক দল যত দুর্বল ও জনবিচ্ছিন্ন হয়, ততই রাজনৈতিক চক্রান্ত বাড়ে। বাংলাদেশেও এখন তাই ঘটছে।

আলজাজিরার মিথ্যা প্রচারণা তার একটি সাম্প্রতিক প্রমাণ। সরকারি প্রচারযন্ত্র মনে হয় এ ধরনের মিথ্যা প্রোপাগান্ডা প্রতিরোধে ইচ্ছুক নয়, অথবা সক্ষম নয়। আমার আজকের আলোচনার লক্ষ্য সরকারকে আলোচিত বিষয়গুলো সম্পর্কে সতর্ক করা। ‘দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল’-কিন্তু কাণ্ডারি হুঁশিয়ার নয় বলে আশঙ্কা হচ্ছে। শেখ হাসিনা সতর্ক হোন, সময় থাকতে আরও কঠোর হোন, এটাই আমার কামনা।