করোনায় অপূরণীয় ক্ষতির মূখে শিক্ষা 

মোঃ হায়দার আলী।। মহান ও নিবেদিত পেশা হিসেবে শিক্ষকতা সর্বজন স্বীকৃত। মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবেই মনে করা হয় শিক্ষকদের। পাঠদানে আত্ম-নিয়োগ, শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিহিত থাকা সুপ্ত মেধা জাগ্রত করা, দুঃস্থ ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের নিজের অর্থ ব্যয়ে দেশ সেরা হিসেবে গড়ে তোলা শিক্ষকও দেশে বিরল নয়।
এ জন্যই সমাজে শিক্ষকরা সবচেয়ে বেশি সম্মানিত, শিক্ষার্থীরাও যুগে যুগে স্মরণ রাখেন। করনাভাইরাস পাল্টে দিয়েছে আমাদের দৈনন্দিন জীবনাভ্যাস। আমাদের চারপাশে এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তা ভর করে বসেছে। খাদ্যের অনিশ্চয়তা, চাকরি থাকা না থাকার অনিশ্চয়তা, সন্তানের পড়ালেখার অনিশ্চিয়তা, চিকিৎসার অনিশ্চিয়তা, করোনায় মৃত্যু হলে দাফন কাফনের অনিশ্চয়তা। দেশে দেশে মানুষ চাকরি হারাচ্ছে।
কর্মহীন হয়ে পড়ছে শ্রমিক। কলকারখানায় থেমে গেছে উৎপাদনের চাকা। এদিকে গত বছর এপ্রিল মাসের রপ্তানি আয় দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। সরকারের রাজস্ব আদায় হ্রাস পেলেও বৃদ্ধি পেয়েছে রাজস্ব ব্যয়। ব্যয় মেটাতে সরকারের ঘাড়ে বাড়ছে ঋণের চাপ। দেশে দেশে খাদ্য সংকটের আশঙ্কা প্রকট হচ্ছে। এমন এক অনিশ্চিত বিশ্বে শিক্ষা ক্ষেত্রেও দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। বিজনেস ইনসাইডারের তথ্যানুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ১৮৮টি দেশের শিক্ষার্থীরা করোনাকালে সরাসরি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। বাধাগ্রস্ত হয়েছে তাদের শিক্ষাকাল। স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ।
শিক্ষার্থীরা ঘরবন্দি। অবশ্য কিছু কিছু দেশে পরিস্থিতি ভেদে স্কুল-কলেজ খুলে দিতে শুরু করেছে। তবে তা খুবই সীমিত আকারে। বাংলাদেশে প্রায় দেড় বছর  ’ সময় ধরে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। কবে আবার শিক্ষা কার্যক্রমকে স্বাভাবিক করা যাবে সেটাও অনিশ্চিত। যখন কলামটি লিখছি তখন করোনায় বেসামাল গোটা বিশ্ব, মহামারী করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের তাণ্ডবে তটস্থ গোটা বিশ্ব।
বিশ্বে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃত্যু সংখ্যা কোনোভাবেই কমছে না। সবশেষ করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ কোটি ৫৫ লাখ ৭৬ হাজার ৬৫৬ জন। আর এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বিশ্বে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৪ লাখ ৩২ হাজার ৩৩ জনে। এর মধ্যে সুস্থ হয়েছে ১৪ কোটি ৪৬ লাখ ২৬ হাজার ৭৬৯ জন।
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ও প্রাণহানির পরিসংখ্যান রাখা ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডওমিটার থেকে বৃহস্পতিবার (২০ মে) সকালে এই তথ্য জানা গেছে।
ওয়ার্ল্ডওমিটারের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, করোনায় এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ ও মৃত্যু হয়েছে বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশ যুক্তরাষ্ট্রে। তালিকায় শীর্ষে থাকা দেশটিতে এখন পর্যন্ত করোনা সংক্রমিত হয়েছেন ৩ কোটি ৩৮ লাখ ২ হাজার ৩২৪ জন আর ৬ লাখ ১ হাজার ৯৪৯ জন মারা গেছেন।
করোনায় আক্রান্তের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারত। তবে ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃতের তালিকায় দেশটির অবস্থান চতুর্থ। দেশটিতে মোট আক্রান্ত ২ কোটি ৫৭ লাখ ৭১ হাজার ৪০৫ জন এবং মারা গেছেন ২ লাখ ৮৭ হাজার ১৫৬ জন।
ল্যাটিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিল করোনায় আক্রান্তের দিক থেকে তৃতীয় ও মৃত্যুর সংখ্যায় তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। দেশটিতে মোট শনাক্ত রোগী ১ কোটি ৫৮ লাখ ১৫ হাজার ১৯১ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ৪ লাখ ৪১ হাজার ৮৬৪ জনের।
বিশ্বে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় সবার ওপরে থাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত হয়েছে ৩৮ হাজার ২০৫ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ৭৭৩ জনের। যা নিয়ে দেশটিতে এ পর্যন্ত মোট করোনা আক্রান্ত হয়েছে ৩ কোটি ৩৬ লাখ ৬৪ হাজার ১৩ জন এবং মারা গেছে ৫ লাখ ৯৯ হাজার ৩১৪ জন। আক্রান্ত হিসেবে চিকিৎসাধীন ৬৩ লাখ ৫১ হাজার ৮৭৮ জন।
এর পরের স্থানেই অবস্থান করা এশিয়ার জনবহুল দেশ ভারতে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দৈনিক সংক্রমণের সংখ্যা বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। গত ২৪ ঘণ্টাতেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি, শনাক্ত হয়েছে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯৮৭ এবং মারা গেছে ৩ হাজার ৮৭৯ জন। যাতে এ পর্যন্ত মোট করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৪৩ লাখ ৭২ হাজার ৯০৭ জনে। আর মৃত্যু হয়েছে ২ লাখ ৬৬ হাজার ২২৯ জনের। চিকিৎসাধীন ৩৬ লাখ ৭৩ হাজার ৭৮০ জন।
তালিকার তৃতীয় স্থানে রয়েছে ব্রাজিল। ল্যাটিন আমেরিকার ফুটবলপ্রিয় দেশটিতে গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছে ২ হাজার ১৮৯ জন এবং শনাক্ত হয়েছে ৮৪ হাজার ৪৮৬ জন। যা নিয়ে এ পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা ১ কোটি ৫৫ লাখ ২১ হাজার ৩১৩ জন। আর মৃত্যুর সংখ্যা বেঁড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৩২ হাজার ৭৮৫ জনে। চিকিৎসাধীন ১০ লাখ ৬০ হাজার ১৭৩ জন।
তালিকায় এরপরের স্থানে থাকা ফ্রান্স, তুরস্ক, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও ইতালিতে সংক্রমণের সংখ্যা ৪০ থেকে ৬০ লাখের মধ্যে থাকলেও তুরস্ক বাদে ওই দেশগুলোতে মৃত্যু লাখ ছাড়িয়েছে। ৩৩ নম্বরে থাকা বাংলাদেশেও মৃত্যুর সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১২ হাজার।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তের করোনা বুলেটিন চলছে একটু দেখে নি তথ্য গুলি, কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে আরও ৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে বৈশ্বিক মহামারিতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ২৮৪ জনে।
একই সময়ে নতুন করে করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন ১৪৫৭ জন। এ নিয়ে মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা হলো ৭ লাখ ৮৫ হাজার ১৯৪জন।  নতুন সুস্থ্য হয়েছে ১ হাজার ৩৭৮ জন, মোট সুস্থ্য ৭ লাখ ২৭ হাজার ৫১০ জন।
বৃহস্পতিবার  স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
গত বছরের ৮ মার্চ প্রথম রোগী শনাক্ত হয় দেশে। প্রথম মৃত্যু হয় ১৮ মার্চ। সম্প্রতি করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে সংক্রমণ বেড়ে যায়। এতে মৃত্যুর মিছিলও বড় হয়। গত বছর ডিসেম্বরের শেষ দিকে চীনের উহান শহর থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস এখন বৈশ্বিক মহামারীতে পরিণত হয়েছে। জন্স হপকিন্সের তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত এ ভাইরাসে বিশ্বজুড়ে আক্রান্তের সংখ্যা এখন পর্যন্ত ৬৯ লাখেরও বেশি। আর মৃতের সংখ্যা চার লাখেরও বেশি। বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাস আক্রান্ত শনাক্ত হয় গত ৮ মার্চ। সেদিন তিনজন আক্রান্ত শনাক্ত হওয়ার কথা জানায় সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)। এরপর মার্চ মাস শেষে ৫০ জনের মতো শনাক্তের কথা জানা গেলেও এ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে আক্রান্তের হার বাড়তে থাকে খুব দ্রুত।
বরাবরের মতোই করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষিত থাকতে সবাইকে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, মুখে মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার অনুরোধ জানান ডা. নাসিমা। করোনাভাইরাসের প্রকোপে এখন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে গোটা বিশ্ব।  শিক্ষা মন্ত্রণালয় মাধ্যমিক পর্যায়ে সংসদ টিভির মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করেছে।  স্কুল, কলেজ, মাদ্রসাসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনলাইন ক্লাস চালু করার সরকারী নির্দেশনা থাকলেও বেশীরভাগই শিক্ষা সে নির্দেশনা পালন করছেন না।
মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষার্থীদের জন্যও একইভাবে চালু করা হয়েছে টিভিতে সীমিত আকারে পাঠদান। যদিও ক্লাসের গুণগতমান ও তার কার্যকারিতা নিয়ে দেশের ভিতরে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ও টিভিতে প্রাথমিকের ক্লাস চালু করেছে। যদিও প্রন্তিক জনপদে টিভি না থাকারও অভিযোগ রয়েছে। অনেক এলাকায় সংসদ টিভি দেখা যাচ্ছে না অভিযোগ রয়েছে। যে সব এলাকায় সংসদ টিভি দেখা যায় না সে সব এলাকার প্রতিষ্ঠানের তথ্য চেয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর চিঠি দিয়েছেন। আবার যাদের টিভি আছে তারাও মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে সঠিকভাবে ক্লাসে যোগদান করতে পারছে না। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে গত বছর  ১৭ মার্চ থেকে বন্ধ রয়েছে দেশের সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অব্যাহতভাবে বন্ধ রয়েছে।
গত বছর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা  মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম সায়মিক পরীক্ষাও নেয়া সম্ভব হয় নি ফলে অটো পাস পেয়েছে শিক্ষার্থীরা।
 শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও কিছু অসৎ, প্রাইভেটবাজ ও কোচিংবাজ শিক্ষক অর্থের লোভে শিক্ষার্থীদের ঝুঁকির মধ্যে রেখে তাদের প্রাইভেট কোচিং চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলের তারিখ কয়েক বার পরিবর্তন করে দেরীতে হলেও অনলাইনে প্রকাশ করা সম্ভাব হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সেমিস্টার ফাইনালও আটকে আছে। ফলে প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থা একযোগে হুমকির মুখে পড়েছে। এবছর মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষা নেয়া সম্ভব হলেও বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য ভর্তি পরীক্ষা নেয়া সম্ভব হয়নি।
এ অবস্থায় করণীয় ঠিক করতে কাজ করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। আন্তর্জাতিকভাবে পরিচালিত হয় ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের পড়ালেখা এবং সারা বিশ্বে একই দিনে অনুষ্ঠিত হয় পরীক্ষা। করোনা প্রাদুর্ভাবের বর্তমান পরিস্থিতিতে অ্যাডেক্সেল ও ক্যামব্রিজের অধীনে গত  বছরের মে-জুনের ‘ও’ এবং ‘এ’ লেভেলের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে না বলে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল । জুনে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর বার্ষিক পরীক্ষাও প্রয়োজনে অনলাইনেই গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছে একাধিক স্কুল কর্তৃপক্ষ জানা গেছে, করোনা পরিস্থিতির আবহে দেশে জাতীয় কারিকুলামের অধীনে পরিচালিত শিক্ষাব্যবস্থার করণীয় ঠিক দকরতে কাজ শুরু করেছে দুই মন্ত্রণালয়।
তবে কবে নাগাদ করোনার প্রাদুর্ভাব কমবে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খোলা সম্ভব হবে, সেটাই বুঝতে পারছেন না মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। ২৯ মে পর্যন্ত বন্ধ রয়েছে সবধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এসাইনমেন্ট এর মাধ্যম শিক্ষর্থীদের মূল্যায়নের নির্দেশনা দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রণালয়। এ জন্য আপাতত যেভাবে টেলিভিশনে ক্লাস সম্প্রচার করা হচ্ছে সেভাবেই পড়ালেখা চালিয়ে যেতে চান তাঁরা। তবে অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যবস্থা করা এবং সিলেবাস কিছুটা সংক্ষিপ্ত করে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছ সূত্র জানায়, করোনায় প্রাথমিক শিক্ষার জন্য করণীয় ঠিক করতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব আকরাম-আল-হোসেনকে চেয়ারম্যান এবং ইউনিসেফ বাংলাদেশের হেড অব এডুকেশনকে কো-চেয়ারম্যান করে একটি কমিটি করা হয়েছে। ইতিমধ্যে এ কমিটি তিনটি ভার্চুয়াল মিটিং করেছে।
গণশিক্ষা সচিব বলেন, ‘টেলিভিশনে ক্লাস সম্প্রচার করা হচ্ছে। অনলাইনের ক্লাস কিন্তু শতভাগ শিক্ষার্থীর পক্ষে এই ক্লাস দেখা সম্ভব হচ্ছে না। এ জন্য আমরা অভিভাবকদের মোবাইলে এসএমএসের মাধ্যমে পড়ালেখার আদান-প্রদান শুরু করতে যাচ্ছি। এতে অন্তত কী পড়তে হবে তা জানতে পারবে শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া নিজ নিজ শিক্ষকদেরও আমরা খোঁজ খবর রাখতে বলেছি।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরকে ক্ষতি নিরূপণ ও রিকভারি প্ল্যান তৈরি করতে বলা হয়েছে। ঈদের পর স্কুল খুললে অতিরিক্ত ক্লাসেরও ব্যবস্থা করা হবে।’ কিন্তু করোনা ভাইরাসের প্রদুর্ভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় গত বছর ১৫ জুলাই থেকে  শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অফিস খোলার অনুমতি দেয়া হয়েছে, বিজ্ঞানাগার, পাঠাগার প্রভূতি সংরক্ষণ পুরস্কার পরিচ্ছন্ন জন্য। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব মাহবুব হোসেন জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বলেছিলেন , ‘আমরা আরো কিছুদিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে চাই। এরপর শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পোষাতে যা যা করার দরকার তার সবই মন্ত্রণালয় থেকে করা হবে। দেশের নামিদামি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর বেশির ভাগেই চলছে অনলাইনে পড়ালেখা। তবে যেসব স্কুল এখনো অনলাইনে যেতে পারেনি, তারা পিছিয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও গ্রিন জেমস ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের অধ্যক্ষ ড. জি এম নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘ মে-জুনের ও এবং এ লেভেল পরীক্ষা এবার হবে না। এর পরিবর্তে স্কুল বেসড অ্যাসেসমেন্ট করা হবে।
শিক্ষার্থীরা সারা বছর যে পড়ালেখা করছে এর ওপর নিজ নিজ স্কুল তাদের মূল্যায়ন করে গ্রেড দেবে। এরপর সেটা পাঠানো হবে ইন্টারন্যাশনাল শিক্ষা বোর্ডে। সেখানে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর ডাটা রয়েছে। স্কুলের আগের বছরগুলোর ফল রয়েছে। সব কিছু অ্যানালাইসিস করে ইন্টারন্যাশনাল বোর্ড প্রত্যেক শিক্ষার্থীর গ্রেড ঠিক করবে।’ শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড এটা অতি পুরাতন কথা। আর বর্তমানকালে বলা হচ্ছে, আধুনিক তথা কর্মমুখী শিক্ষা ছাড়া শিক্ষা মূল্যহীন। এর সাথে নৈতিকতা ও মানকেও সম্পৃক্ত করা হয়েছে। তাই এসব ক্ষেত্রে যারা যত অগ্রগামী হচ্ছে, তারা তত উন্নতি করছে। তাই বেশিরভাগ দেশ এসবের দিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে। তবে, এতে সব দেশই যে সমান সফল হয়েছে, তা নয়। তথাপিও যতটুকু উন্নতি করেছে, তাও থমকে গেছে করোনা মহামারিতে।
গত বছর ৩১ ডিসেম্বর চীনের উহানে করোনা সনাক্ত হওয়ার পর এর বিশ্বায়ন হয়েছে খুব দ্রুত। যা মোকাবেলার জন্য একে একে প্রায় সব দেশ লকডাউন করেছে। ফলে সব খাতের মতো স্বাস্থ্য খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইউনিসেফ গত বছর ২৫ এপ্রিল বিবৃতিতে জানিয়েছে, করোনাভাইরাসের কারণে হাম, ডিপথেরিয়া, পোলিওসহ বিভিন্ন রোগের টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। আর এ কারণে লাখ লাখ শিশুর জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। অথচ প্রতি বছর দুই কোটির বেশি শিশুকে এসব টিকা দেওয়া হয়। কিন্তু ১.৩০ কোটির বেশি শিশু এসব টিকা এখনো নেয়নি।
সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বার্কলে বলেছেন, ‘যেসব শিশু বর্তমানে টিকা নিচ্ছে না; তাদের সারাটা জীবনই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। হাম কিংবা পোলিওর চেয়ে করোনাভাইরাস শক্তিশালী নয়। কিন্তু করোনার জেরে সেসব রোগের টিকা শিশুদের দেওয়া থেকে বিরত থাকার মতো ঘটনা ঘটছে।’ এর জের পড়বে শিক্ষায়।
অন্যদিকে, লকডাউনের কারণে দীর্ঘদিন বাড়িতে বন্দি থাকার কারণে শিশুরা স্থূল হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া, দুরন্তপনা থেমে যাওয়ায় এবং বন্ধুদের সাথে দেখা ও খেলা করতে না পারায় তারা মানসিকভাবে পর্যুদস্ত হয়ে পড়েছে। খাওয়া-দাওয়া করছে না ঠিকভাবে। ফলে চরম অপুষ্টি শিকার হচ্ছে। তন্মধ্যে গরীবরা বেশি। উপরন্তু হৈ-চৈ, চিৎকার, চেঁচামেচি, মারামারি, ভাঙচুর ইত্যাদি করছে। আগে যে কাজটি তারা রাস্তা-ঘাটে ও খেলার মাঠে করতো, সে কাজ এখন বাড়িতেই করছে তারা। এরও জের পড়বে শিক্ষায়। এই অবস্থার অবসান কবে হবে তা কেউই জানে না। তাই বিভিন্ন দেশ লকডাউনের মধ্যে শিশুদের বাইরে খোলা স্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। যা’হোক, লক-ডাউনের কারণে শিক্ষাখাতও বন্ধ হয়ে গেছে প্রায় ১৪ মাস যাবত। তাতে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে শিক্ষার্থীরা।
সিএনএন’র খবরে প্রকাশ, ‘ইউনেস্কোর তথ্য মতে, বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৯০টি দেশের শিক্ষার্থীরা লকডাউনে আছে। অর্থাৎ স্কুল বন্ধ থাকার কারণে সারা বিশ্বের ৯০ শতাংশেরও বেশি শিক্ষার্থী এখন বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করছে। সব দেশেই আর্থিকভাবে সচ্ছলদের তুলনায় অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ধনীদের মতো অনলাইন ক্লাসে অংশ নেওয়ার কম্পিউটার, অন্যান্য ডিভাইস ও ইন্টারনেট সংযোগ এবং নিরাপদ ও পড়াশোনার উপযোগী পরিবেশ পাচ্ছে না তারা। আর্থিক অনিশ্চয়তার কারণে তারা মানসিকভাবেও ভালো নেই। সব মিলিয়ে করোনা মহামারীর পর ধনী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের ফলাফলের পার্থক্য অনেক বেড়ে যাতে পারে।
এছাড়া, সেভ দ্য চিলড্রেনের ডিরেক্টর হ্যাজার্ড জানান, ২০১৫ সালে ইবোলা মহামারীর সময় সিয়েরা লিওনে স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছিল। এ সময় করা এক গবেষণায় দেখা যায়, মেয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর সহিংসতা ও নির্যাতনের মাত্রা অনেক বেড়ে গেছে। করোনাতেও একই অবস্থা হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো অনেক শিশু শিক্ষার্থীকেই জোর করে অর্থ উপার্জনে নামিয়ে দিতে পারে। তাদের মধ্যে অনেকেই হয়তো পরে আর স্কুলে ফেরার সুযোগ পাবে না।’
উল্লেখ্য যে, ইউনেস্কো এর আগে বলেছে, করোনার কারণে বিশ্বের ১৪০ কোটি শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যদিকে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উন্নত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের অসংখ্য শিক্ষার্থী পড়াশুনা এবং পিএইচডি ও গবেষণা করে। তাদের মধ্যে যারা অসচ্ছল, তারা খন্ডকালীন কাজ করে শিক্ষা এবং থাকা-খাওয়ার ব্যয় বহন করে। কিন্তু লকডাউনের কারণে তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা চরম সংকটে পড়েছে। এছাড়া, সারা পৃথিবীর শিক্ষাব্যবস্থাই একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে। অন্যদিকে, বহু শিক্ষার্থী করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। তন্মধ্যে অনেকেই মারা গেছে। উপরন্তু ব্রিটেনের চিকিৎসকরা সম্প্রতি জানিয়েছেন, করোনা চিকিৎসারত কিছু শিশুর দেহে খুবই বিরল কিন্তু বিপজ্জনক কিছু উপসর্গ দেখা যাচ্ছে।
এই অবস্থা থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয়। কারণ, এ দেশেও করোনার ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। তাই গত বছর  ২৬ মার্চ থেকে চলছে সারাদেশে লকডাউন। অবশ্য সব শিক্ষাঙ্গন বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এর আগেই তথা গতবছর ১৭ মার্চ থেকে। এই অবস্থায় শেষ হয়েছে ২ টি পবিত্র মাহে রমযান। ফলে রোজার ঈদের পরেও এখনও শিক্ষাঙ্গন বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, যা অব্যাহতভাবে চলছে।
অপরদিকে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গত বছর ২৭ এপ্রিল বলেছেন, করোনাভাইরাসের বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। তবে, যখন করোনার প্রকোপ থাকবে না, তবে পরে বলেছেন করোনা ভাইরাসের প্রকোপ না কমায় এখনই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। তিনি আরও বলেন আগে মানুষের জীবন বাঁচাতে হবে। তাই মাউশি থেকে গত বছর মার্চ ও এপ্রিলের বেতন, টিউশন ফি বা অন্যান্য যে কোনও পাওনা আদায়ে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। এই বন্ধের মধ্যেই অভিভাবকদের ক্ষুদে বার্তায় বেতন পরিশোধের তাগিদ দিয়েছে অনেক প্রতিষ্ঠান। গত ১৪ মাসে থেকে  শিক্ষার্থীরা একদিনও না থাকলে মেস ভাড়ার জন্য অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের এসএমএস, মোবাইলে হুমর্কী প্রদান করার অভিযোগে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। এতে চরম বিপাকে পড়েছে বেশিরভাগ অভিভাবক। কারণ, উপার্জন বন্ধ থাকায় তারা চরম সংকটে রয়েছে। মেস মালিকগণ এব্যপারে শিক্ষার্থীদের বাধ্যকরে মেসভাড়া পুরো ভাড়া আদায় করছেন। দেখার যেন কেউ নেই। তাদের ভাবটা যেন এমন দে মা খেয়ে বাঁচি শিক্ষার্থী আর অভিবাবক যাক আর যাক এতে কিছু আসে যায় না।
লকডাউনের কারনে ঘরেও শিক্ষার্থীদের শিক্ষার প্রতি মনোযোগ নেই তেমন। কারণ, করোনা আতংকে সকলেই ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। ফলে শিক্ষা কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। অসংখ্য শিক্ষার্থী টিউশনি, কোচিং, পার্ট টাইম জব করে শিক্ষার ব্যয় বহন করতো। লকডাউনের কারণে এসব বন্ধ থাকায় তারাও বিপদে পড়েছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিভাগগণ বলছেন এবার কোনভাবে  এসএসসি ও এইচএসসি  পরীক্ষা অটোপাস দেয়া যাবে না। শিক্ষাঙ্গন বন্ধ থাকায় ব্যতিক্রম হিসাবে সংসদ টিভিতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের কিছু পাঠদান হচ্ছে। কিন্তু এতে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ তেমন নয় বলে মিডিয়ার খবরে প্রকাশ। অন্যদিকে, অনলাইনে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। কিন্তু সে সুযোগ-সামর্থ্য সকলের নেই। গত বছর  ২৬ এপ্রিল ইউজিসি জানিয়েছে, বর্তমানে ৬৩টি বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পাঠদান চলছে। এর মধ্যে ৫৬টি বেসরকারি ও বাকি সাতটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। এতে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের হার ৬০-৭০%। অপরদিকে, করোনার প্রাদুর্ভাবে ১৭তম শিক্ষক নিবন্ধনের প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষা স্থগিত করেছে এনটিআরসিএ। প্রিলিমিনারি পরীক্ষা ১৫-১৬ মে এবং লিখিত পরীক্ষা ৭-৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। এতে ১১.৭২ লাখ প্রার্থী আবেদন করেছে। এভাবে সব নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল করা হয়েছিল। অনেক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারী করতে পারছে না। ফলে চাকরি প্রার্থীরা চরম ক্ষতির শিকার হয়েছে।
তাদের এই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য ২০২০ সালকে চাকরি প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ‘নন কাউন্টেবল’ করা দরকার। তাহলে তারা ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে শিক্ষায় মোট কথা বিশ্বের প্রায় সব দেশের ন্যায় এ দেশেও শিক্ষার মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। এতে করে এক বছর নষ্ট হয়েছে আর একটি বছর নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। কিন্তু ওই একটি বছর শিক্ষার্থীদের জীবনে মহামূল্যবান। একে নষ্ট করতে দেওয়া সমীচীন ছিল না। শিক্ষার্থীরাও তা চাইবে না। কারণ দু-এক বছরের মধ্যে বহু শিক্ষার্থীর বয়স পূর্ণ হয়ে যাবে সরকারী চাকুরীর ক্ষেত্রে। তাই তাদের কাছে এই এক বছর অতি গুরুত্বপূর্ণ। সর্বোপরি বেশিরভাগ অভিভাবকের সামর্থ্য নেই অতিরিক্ত এক বছরের শিক্ষা ব্যয় বহন করার। আবার প্রাইভেট পড়ে কিংবা কোচিং করে পুষিয়ে নেওয়ার সামর্থ্য নেই বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর। তাই সার্বিক দিক বিবেচনা করে  এ ক্ষতি পুষিয়ে নিতে হবে এবং তা ফুল কোর্সের ভিত্তিতেই। কারণ, কোর্স শর্টকাট করে কিংবা ৬ মাস ড্রপ করে বছর অতিক্রান্ত করা হলে শিক্ষার্থীদের যে ক্ষতি হবে, তা তাদের বহন করতে হবে সারাজীবন। তাই ফুল কোর্স পূরণ করতে হবে। আবার করোনা সৃষ্ট ক্ষতিও পুষিয়ে নিতে হবে। অনেকেই অটো আবার প্রমোশনের কথা বলছে। এটা করা হয়েছিল ১৯৭২ সালে আর গত বছর। যার ক্ষতি চলেছে দীর্ঘদিন। তাই এটা করা অনুচিত।
স্মরণীয় যে, দেশে প্রাথমিকে ভর্তির হার ৯৮%। বর্তমানে নিম্ন থেকে উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা চার কোটির অধিক। এদের মধ্যে নারী-পুরুষ প্রায় সমান। এত বিপুল সংখ্যক মানুষ বিশ্বের ২০০টি দেশের কোনটিতেই নেই। তাই আমাদের মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা দেশের জন্য কল্যাণকর। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই বিপুল শিক্ষার্থীর আউটপুট তেমন সুখকর নয়। কারণ, তারা দক্ষ নয়। ইউনিসেফের ২০১৯ সালের তথ্য মতে, ‘বাংলাদেশের তরুণদের ৭৪% অদক্ষ আর মাত্র ২৬% দক্ষ।’
এ থেকে বোঝা যায়, দেশে দক্ষ লোকের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। যার কিয়দংশ পূরণ করা হচ্ছে বিদেশিদের দিয়ে। তাতে তারা বছরে ৩৫ হাজার কোটি টাকা নিয়ে যাচ্ছে। এদের মধ্যে ভারতীয়রা বেশি। অথচ দেশে মোট যে তরুণ রয়েছে, তারা যদি সকলেই দক্ষ হতো; তাহলে, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার চেয়ে বেশি উন্নতি করবে বাংলাদেশ-এই বক্তব্য শুধু চটকদারই হতো না, বাস্তবেই হতো। (কিন্তু বাস্তবে দেশের সার্বিক উন্নতি কি হয়েছে, তা প্রমাণিত হয়েছে করোনাকালে)। এ সংকট থেকে উদ্ধার পেতে আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোর কাছে সহায়তা চাইতে হচ্ছে! অন্যদিকে, গত  বছর ৬ এপ্রিল প্রকাশিত এফএম গ্লােবাল’র ‘গ্লােবালরেজিলিয়েন্স ইনডেক্স-২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদন মতে, করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলার সামর্থ্যের দিক থেকে ১৩০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১০৬তম। অপরদিকে, ইউএনডিপির প্রতিবেদন মতে, করোনা সংকটে নাগরিকদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ দেশের মধ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ।
এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত আটটি ক্ষেত্রে দেশগুলোর নেওয়া সুরক্ষামূলক ব্যবস্থার তুলনা করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। অপরদিকে, খবরে প্রকাশ, করোনায় সেরে উঠার হার বিশ্বের মধ্যে সর্বনিম্ন বাংলাদেশ! তাই আর্থসামাজিক সমস্যা মোকাবিলার জন্য বাংলাদেশের মানবিক সংস্থাগুলো একজোট হয়ে ‘নিডস অ্যাসেসমেন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ’ গঠন করে কাজ করছে। এতে ৬৫টি সরকারি সংস্থা, জাতিসংঘের সংস্থা ও বেসরকারি সংস্থা রয়েছে। কেয়ার বাংলাদেশ এই গ্রুপের কো চেয়ার হিসেবে কাজ করছে। এছাড়া বিভিন্ন দেশ করোনার চিকিৎসায় সরঞ্জাম দিয়েছে। এটাই হচ্ছে দেশের সার্বিক উন্নতির প্রকৃত স্বরূপ।
দেশের শিক্ষার পদ্ধতি সেই মান্ধাতার আমলেরই রয়েছে, যা আধুনিক যুগে অচল। আর মান কমতে কমতে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের ৬৫% ভালভাবে বাংলাই পড়তে পারে না, আর ইংরেজিতে অবস্থা আরও করুণ বলে ২০১৯ সালে বিশ্ব ব্যাংকের রিপোর্টে বলা হয়েছে। নিম্ন স্তরের শিক্ষার এই মানহীনতার জের উপরের স্তরেও চলছে। এভাবে দেশের শিক্ষা মানহীন হয়ে পড়েছে। যার প্রভাব পড়ছে কর্মক্ষেত্রে। যেনতেনভাবেই হোক শিক্ষার হার বৃদ্ধি করা। আর সে কারণেই শিক্ষার হার বেড়েছে আর শিক্ষার মান কমেছে। এছাড়া, ঝড়ে পড়া তো রয়েছেই। প্রাথমিক থেকে অনেক কিশোরী ঝড়ে পড়ে। এই ঝড়ে পড়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে: দারিদ্র। অন্যদিকে, দেশের অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভালো অবকাঠামো নেই।
খেলার মাঠ ও বিনোদনের তেমন ব্যবস্থা নেই বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। অনেক শিক্ষকেরও মান খারাপ।
নিয়োগের ক্ষেত্রে অনিয়ম ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের অভাবে এই অবস্থা হয়েছে। অপরদিকে, দেশে অসংখ্য প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। কিন্তু এগুলো সরকারি নীতি তেমন পালন করে না বাণিজ্যিকিকরণের ফলে। তাই সাধারণ পরিবারের সন্তানদের সেখানে লেখা-পড়া করার সামর্থ্য নেই। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় আর একটি প্রকট সমস্যা রয়েছে। সেটি হচ্ছে-বাংলা, ইংরেজি, আরবি ইত্যাদি মাধ্যম। যার একটির সাথে অন্যটির মিল নেই। তাই এক মাধ্যমের শিক্ষিতরা অন্য মাধ্যমে কাজ করতে পারেনা। সরকার একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সফল হওয়া আবশ্যক এবং তাতে ইংরেজি ও ধর্মীয় শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে।
উপরন্তু সরকার শিক্ষা আধুনিক করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। যেমন: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার দিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি নগণ্য। দেশে ক্রমশ: বিজ্ঞান শিক্ষার্থীর সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। তবে, আইটির শিক্ষা কিছু বেড়েছে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুব কম। কারিগরি শিক্ষাকেও অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর যে বৃদ্ধির হার (বর্তমানে ৮-১০%। আর বেশিরভাগ দেশে ৫০-৬০%), তাতে কাক্সিক্ষত অবস্থায় পৌঁছতে যথেষ্ট সময় লেগে যেতে পারে। শিক্ষার মানের দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শিক্ষার হার বাড়ানো যত সহজ, শিক্ষার মান বাড়ানো তত সহজ নয়। কারণ, শিক্ষার মানোন্নয়নের সাথে শিক্ষকের মান,শিক্ষাঙ্গনের মান, শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ ইত্যাদি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই ইচ্ছা করলেই রাতারাতি শিক্ষার মানোন্নয়ন ঘটানো সম্ভব নয়। শিক্ষার মানোন্নয়ন চাইলে এসব আগে করতে হবে। বিবিএস’র তথ্য মতে, দেশের ২৫-৬০ বয়সী মানুষের ৩৭% নিরক্ষর। যারা সাক্ষরযুক্ত, তাদেরও মান অতি নিম্নতর। অর্থাৎ সার্বিকভাবে দেশের শিক্ষার উন্নতি ও মানোন্নয়নের জন্য প্রচুর বিনিয়োগ করতে হবে এবং তা জিডিপির কমপক্ষে ৬%। এ অভিমত বিশেষজ্ঞদেরও। শিক্ষাবিদ ও বুয়েটের অধ্যাপক মোহাম্মদ কায়কোবাদ সম্প্রতি বলেছেন, ‘মধ্যম কিংবা উচ্চ আয়ের দেশ হতে হলে আমাদের জাপান, কোরিয়া, তাইওয়ানের মতো দক্ষ হতে হবে। এই দক্ষতা অর্জনের চাবিকাঠি হলো শিক্ষা এবং তা বিশ্ব মানের।’
যা’হোক, করোনা সৃষ্ট ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য কৃষি খাতে, শিল্প খাতে, সেবা খাতে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। লকডাউন উঠে যাওয়ার সাথে সাথে এসব খাতে পুনোর্দ্যমে কাজ শুরু হয়ে যাবে। পাশাপাশি শিক্ষার ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এ দায়িত্ব মূলত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। তবে, এ ক্ষেত্রে শিক্ষাবিদদের এগিয়ে আসতে হবে। এর বাইরে আমাদের মতো সাধারণ লোকের পক্ষে শিক্ষার ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। করোনা সৃষ্ট শিক্ষার ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য ঐচ্ছিক ছুটি বন্ধ, অতিরিক্ত ক্লাস নিয়ে গ্যাপ পূরণ, শিক্ষকদের ভালো নোট দেওয়া ইত্যাদি আবশ্যক।
আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এই বছরের কোন ফি নিতে পারবে না। প্রতিষ্ঠানের জনবলের বেতন সরকারকে বহন করতে হবে এবং তা বেসরকারি খাতেরও। অন্যদিকে, অনলাইন ও দূরশিক্ষণ ভিত্তিক শিক্ষা চালু করা দরকার বলে অনেক শিক্ষাবিদের অভিমত। হ্যাঁ, বিভিন্ন দেশ শিক্ষা খাতে নানা প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যাপক সুফল পাচ্ছে। আমাদেরও সেদিকে অগ্রসর হতে হবে। এর সাথে বেতারকেও সম্পৃক্ত করতে হবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ সরকারি অনুমোদন নিয়ে ‘জুম’ অ্যাপস ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে সীমিত আকারে তাদের পাঠ ও পঠন চালু করার চেষ্টা করে যাচ্ছে, যদিও দেশের অধিকাংশ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার গুণগতমান নিয়ে কমবেশি সমালোচনা রয়েছে। তারপরও দেশে উচ্চশিক্ষা বিস্তারে তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে এ উদ্যোগ এখনও সেভাবে চোখে পড়েনি। তবে দু’ একটি বিশ্ববিদ্যায়লয় যে অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম সীমিত আকারে শুরু করেনি তা কিন্তু নয়।
তবে সে সংখ্যাটা খুবই সীমিত। কিছু শিক্ষক আবার স্ব-উদ্যোগী হয়েও জুম অ্যাপস্ এর মাধ্যমে ক্লাস নিয়ে তার সচিত্র বিবরণ ফেসবুকে পোস্ট করে অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন, যা থেকে জানা যায় যে, ৩৫-৪০% শিক্ষার্থী পূর্বে ঘোষণা দেয়া সত্ত্বেও ক্লাসে অনুপস্থিত থাকছে। কিন্তু কেন? সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরাই তার কারণ নির্ণয় করে বলছেন ছাত্রদের অস্বচ্ছলতার কারণে এমবি/নেট কিনতে না পারা বা কারো কারো তা আবার কেনার সামর্থ থাকলেও নেট ভয়াবহ রকমের স্লাে, আবার আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে এন্ড্রয়েড ফোন না থাকাটাও অন্যতম কারণ। এনিয়ে তো দেশের একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও এক শিক্ষার্থীর তর্কযুদ্ধ দেশের এক জাতীয় পত্রিকার মাধ্যমে দেশবাসী অবগত হয়েছে, তা হলে এখন আমাদের করণীয় কী? কতদিন বা আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হবে? কীভাবে এ ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া যাবে? তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
একদিন না একদিন আমাদেরকে তো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেবার সিদ্ধান্ত নিতেই হবে। কারণ বর্তমান দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় অনলাইন ক্লাস পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে পুরোপুরি যে কার্যকর হবে না তা ধরেই নেয়া যায়। কারণ, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের অধিকাংশ শিক্ষার্থী হয় মধ্যবিত্ত না হয় নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। সুতরাং তাদের পক্ষে এমবি/নেট ক্রয় করে নিয়মিত ক্লাসে অংশগ্রহণ সম্ভবপর নাও হতে পারে। তবে স্বাস্থ্যবিধি পালন করে আমাদেরকে কিন্তু একদিন না একদিন ক্লাসরুমে ফিরতেই হবে। সরকার ইতোমধ্যেই এ সংক্রান্ত বিধিবিধান প্রণয়ন করেছে, যা এখন নেট দুনিয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমরা যেটাই করতে যাই না কেন তার আগে করোনার বহুমাত্রিক রূপ ও তার ভয়াবহ প্রভাব মাথায় রেখেই করতে হবে। নিতে হবে সঠিক সিদ্ধান্ত এবং তা বাস্তবায়নে ছক কষতে হবে নিখুঁতভাবে।
এখানে কোনো প্রকার হটকারী সিদ্ধান্ত কাম্য নয়। তা নাহলে শিক্ষাক্ষেত্রে ভয়াবহ স্বাস্থ্য বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। প্রতিষ্ঠান খোলার আগে আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের ক্লাসরুম ভিত্তিক আসন বিন্যাস, স্বাস্থ্য-সুরক্ষা সরঞ্জামাদীর সহজ প্রাপ্যতা নিশ্চিত করেই তা করতে হবে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব কতটা নিশ্চিত করা যাবে তা কিন্তু ভাববার বিষয়। তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই। এতে হীতে বিপরীত ফলও হতে পারে। এতদিন পর বলা হচ্ছে, জীবন ও জীবিকা দু’টোই পাশাপাশি চালাতে হবে। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে আমরা তো আজ এক ভয়াবহ রকমের স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেছি। বলা হলো, স্বাস্থ্যবিধি মেনেই শপিংমল ও দোকান খোলা হয়েছে, সীমিত আকারে পরিবহন চলছে কিন্তু খোলার পর দেখা গেলো তা মানার কোনো বালাই নেই। যে জাতির কাছে জীবন নয় উৎসবই মুখ্য, সে জাতির কপালে যে দুঃখ আছে তা তো দিনদিন আরো প্রকট হচ্ছে। দেশে সীমিত অফিস আদালত, গণপরিবহন চলছে, রাস্তায় মানুষের ঢল। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। অপ্রতুল চিকিৎসা সেবা। এখন তো দেশে আর অন্যান্য রোগে অসুস্থ রোগীরও চিকিৎসা পাওয়া দুস্কর হয়ে পড়েছে।
যারা ভাবছেন যে, ইউরোপ, আমেরিকা, সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়া অনলাইনে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে পারলে আমরা নয় কেন, তাদেরকে বলছি, আমরা যে তাদের মতো অনেক কিছুই পারি না, এমনকি তারাও যে সব পারে না তা কিন্তু করোনা আমাদেরকে দু’চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। সুতরাং করোনার মতো এক কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের সামর্থ্যরে মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যারা করোনার কারণে সেশনজট বৃদ্ধি পাবে বলে সরব হবার চেষ্টা করছেন তাদের অনুরোধ করবো, অনুগ্রহ করে ৮০’র দশকের এরশাদ ভ্যাকেশনের কথা একবার ভেবে দেখুন। তখন শিক্ষা জীবন শেষ করতে প্রতিষ্ঠান ভেদে ৭/৮ বছর সময় লেগেছিলো। আমরা কিন্তু সেখান থেকে পরিত্রাণ পেয়েছি।
আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকরাই তা করতে সহযোগিতা করেছেন। কিন্তু আজ যখন দেখি একজন শিক্ষক সময়মত পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন না করার কারণে ফলাফল প্রকাশে বিলম্ব হচ্ছে, ক্লাস না নেবার কারণে সময়মত সিলেবাস শেষ করতে পারেন না বলে রুটিন অনুযায়ী পরীক্ষা না নেয়ার কারণে সেশনজট বেড়ে যায়, তখন কিন্তু তা জাতিকে হতাশ করে। আজ কিন্তু বাঁচার জন্য ঘরে থাকাটা খুবই জরুরি। করোনা থেকে মুক্ত থাকার জন্য সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা করাই কিন্তু একমাত্র উপায়। এখনও করোনা ভ্যাকসিন নাগালের বাইরে। কবে তা পাওয়া যাবে তাও নিশ্চিত নয়। এমন এক জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গোটাবিশ্বের শিক্ষা ব্যবস্থা। বাংলাদেশের পরিস্থিতি আরও নাজুক। ইচ্ছে থাকলেও ভৌত ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর অপ্রতুলতার কারণে হয়তো পুরোপুরি অনলাইন ক্লাস ও পরীক্ষায় যাওয়া এখনই সম্ভবপর হবে না। তাছাড়া ছাত্রছাত্রীদের আর্থিক অস্বচ্ছলতার বিষয়টাও না পারার অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচনার দাবি রাখে।
এমন এক জটিল পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় কী, সেটা সুচারুভাবে নির্ধারণ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদি করোনাকাল আরো দীর্ঘায়িত হয় তাহলে হয়তো আমাদেরকে বাধ্য হয়েই অনলাইন ক্লাস ও পরীক্ষায় যেতে হবে। তবে সেক্ষেত্রে নিম্নোক্ত দু’টি বিষয় বিবেচনা করে তা করা গেলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় তা করোনাকালের আশির্বাদ বলেই বিবেচিত হবে।
এক. প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি ও ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন করে সময়োপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে, যাতে করে অনলাইনে ক্লাস ও পরীক্ষাসমূহ গ্রহণ করা সংশ্লিষ্ট সবার কাছে সহজসাধ্য হয়।
দুই. অনলাইনে ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য শিক্ষার্থীদেরকে বিনা পয়সায় ইন্টারনেট ব্যবহার করার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ ইন্টারনেট সার্ভিস ফ্রি করার জন্য ব্যবস্থা করবেন। যারা একেবারেই অস্বচ্ছল তাদেরকে প্রয়োজনমতে এন্ড্রয়েড মোবাইল সেট সরবরাহ করতে হবে।
আর যদি মনে হয় যে, করোনামুক্ত হয়ে আমরা আগামী দু’চার মাসের মধ্যেই ক্লাসরুমে ফিরে যেতে পারবো, তা হলে তাড়াহুড়ো না করে অপেক্ষা করাই যুক্তিযুক্ত হবে। এক্ষেত্রে পরবর্তীতে ক্লাসের সংখ্যা বাড়িয়ে বা শীতকালীন ছুটি কমিয়ে করোনাকালের ক্ষতিটা সহজেই পুষিয়ে নেয়া যাবে। আমাদের দেশে শিক্ষিতের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু শিক্ষার গুণগত মান হয়েছে নিম্নমুখী। তাই শর্টকাট কোনো পদ্ধতি অবলম্বন না করে ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাটাই হবে যুক্তিযুক্ত।
আবেগ নয়, তথ্য ও যুক্তির উপর ভর করেই আমাদেরকে এ যাত্রায় অগ্রসর হতে হবে। অনলাইনে ক্লাস গ্রহণে আমার নিজের একটা অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চাই, যার মধ্যদিয়ে পাঠক সহজেই এ সংক্রান্ত একটা সুস্পষ্ট ধারণা পেতে পারেন। দেশের ইন্টারনেটের গতি অত্যন্ত স্লাে। তাই অনেক সময় অন লাইন ক্লাস কাজে আসে না। টাকা দিয়ে এমবি কিনে এ ধরনের ব্যয়বহুল শিক্ষাব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করা তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। এ অভিজ্ঞতা শুধু একজন ছাত্রের নয় অনেকের। যারা অনলাইনে ক্লাস নিয়েছেন তাদের অভিজ্ঞতাও ঠিক অনুরূপ। সুতরাং দেশের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করেই দ্রুত শিক্ষ প্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। জাতি কোনো বিষয়ে অযথা তাড়াহুড়ো চায় না।

সর্বশেষ সংবাদ