ইসলাম ও মানবাধিকার

প্রিয় নবী বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে আল্লাহর হক ও বান্দার হক তথা মানবাধিকার বিষয়ে স্পষ্ট ঘোষণা করে গেছেন। কেননা মহান রব্বুল আলামিন কুল-কায়িনাত তথা বিশ্বব্রহ্মা- সৃষ্টি করে তাতে আশরাফুল মাখলুকাত মানব জাতিকে প্রেরণ করে তিনি যা কিছু বিধানাবলি প্রদান করেছেন তা তাঁর নিজের জন্য নয়। সবই মানুষের কল্যাণ ও উন্নতির জন্য। যেমন নামাজ রোজা হজ জাকাত দান-খয়রাত পরোপকার ইত্যাদি কর্মে অবহেলা করা অথবা ব্যভিচার মদপান সুদ-ঘুষ ইত্যাদি নিষিদ্ধ কর্মে লিপ্ত হওয়ার বিধান। এগুলো লঙ্ঘন করলে আল্লাহর হুকুম অমান্য করা হয়। এগুলোকে হক্কুল্লাহ বা আল্লাহর অধিকার বলা হয়। অন্যদিকে রয়েছে হক্কুল ইবাদ বা সৃষ্টিজগতের অধিকার। অর্থাৎ এগুলোয় আল্লাহর হক ছাড়াও বান্দার হক জড়িত। যেমন কারও প্রাপ্য না দেওয়া, কাউকে গালি দেওয়া, গিবত, সমালোচনা ও চোগলখোরি ইত্যাদির মাধ্যমে মানহানি করে কষ্ট দেওয়া। কারও সম্পদ, অর্থ, সম্মান বা জীবনের কোনো ধরনের ক্ষতি সাধন। ফাঁকি, ধোঁকা, সুদ-ঘুষ জুলুম-অত্যাচার, খুন-ধর্ষণ সবই এ-জাতীয় পাপ। এ ছাড়া আল্লাহ এবং তাঁর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলিম সমাজের প্রতিটি মানুষের প্রতি অন্য মানুষের কিছু দায়িত্ব নির্ধারণ করেছেন। যেমন স্বামী-স্ত্রী, পিতা-মাতা-সন্তান, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, কর্মকর্তা-কর্মচারী, সহকর্মী, দরিদ্র, বিপদগ্রস্ত, অসুস্থ, অসহায়, বিধবা, ইয়াতিম, পালিত পশুপাখিসহ অন্য সব দায়িত্ব। এগুলো যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন না করলে হক্কুল ইবাদ বা সৃষ্টির অধিকার নষ্টের পাপে আখ্যায়িত হবে। অতএব প্রথম প্রকারের পাপের জন্য মহান আল্লাহর দরবারে কায়মনোবাক্যে ক্ষমা প্রার্থনা করলে আল্লাহ তা ক্ষমা করবেন বলে কোরআন-হাদিসে বারবার সুসংবাদ প্রদান করা হয়েছে। দ্বিতীয় প্রকার পাপে আল্লাহর বিধানের অবমাননা এবং আল্লাহর কোনো সৃষ্টির অধিকার নষ্ট করা রয়েছে, তাই এসব পাপ থেকে বান্দা যখন আন্তরিকতার সঙ্গে অনুতপ্ত হয়ে ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করে তখন আল্লাহ তার বিধান ক্ষমা করতে পারেন। কিন্তু চূড়ান্ত বিচার দিনের মহান বিচারক তাঁর কোনো সৃষ্টির প্রাপ্য ক্ষমা করেন না, তার পাওনা তিনি বুঝে নেবেন ও তাকে বুঝিয়ে দেবেন। এজন্য এ-জাতীয় পাপের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, ব্যক্তিবর্গ যাদের অধিকার নষ্ট বা সংকুচিত হয়েছে, তাদের কাছ থেকেই তার প্রাপ্য অধিকার বুঝিয়ে দিয়ে ক্ষমা না নিলে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। এজন্য কোরআন-হাদিসে বান্দার হকের বিষয়ে অত্যন্ত বেশি গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। আমাদের চারপাশে অবস্থানরত আল্লাহর অন্যান্য সৃষ্টিকে কোরআন-হাদিসের আলোকে কয়েকটি পর্যায়ে ভাগ করতে পারি। ১. সাধারণভাবে সব সৃষ্টির অধিকার ২. সব মানুষের অধিকার ৩. সব মুসলিমের অধিকার ৪. দায়িত্বাধীন ও পরিবারের সদস্যদের অধিকার। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘যদি কোনো মানুষ একটি চড়ুই পাখি বা তার চেয়ে বড় কিছু বিনা প্রয়োজনে অন্যায়ভাবে হত্যা করে, তাকে কিয়ামতের দিন আল্লাহ এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করবেন।’ মুস্তাদরাক হাকিম। নবী (সা.) আরও বলেন, ‘একটি বিড়ালের কারণে একজন মহিলা জাহান্নামে যায়। সে বিড়ালটিকে বেঁধে রেখেছিল অথচ তাকে খাদ্য দেয়নি, আবার বাইরে পোকামাকড় খাওয়ার জন্য তাকে ছেড়েও দেয়নি।’ বুখারি। ইসলামই সর্বপ্রথম জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষকে সমমান বলে ঘোষণা করেছে এবং মোমিনদের নির্দেশ দিয়েছে সবার অধিকার বুঝিয়ে দিতে। কারও প্রাপ্য নষ্ট করা বা কাউকে কষ্ট দেওয়ার অধিকার কোনো মুসলিমের নেই। সবার জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।