পুরো পরিবারের দায়িত্ব নিলেন পুলিশ সুপার সুদীপ চক্রবর্তী

সঞ্জু রায়, স্টাফ রিপোর্টার: করোনায় ক্ষতিগ্রস্থ বগুড়া নাটাইপাড়ার মায়িশা ও তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন বগুড়া জেলা পুলিশ। করোনায় স্বামী হারিয়ে শিক্ষক মায়িশা এখন পরিচ্ছন্নতাকর্মী এমন শিরোনামে জাতীয় একটি পত্রিকার সংবাদ দৃষ্টিগোচর হওয়ার সাথে সাথেই মঙ্গলবার দুপুরে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে মানবিকতার টানে মায়িশা কে ডেকে এনে উপহারস্বরুপ নগদ অর্থ সহায়তা, তার শিশুদের ভাল পোষাক এবং তার একটি ভাল মানের চাকুরীর জন্যে সর্বোচ্চ সকল যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বগুড়া জেলা পুলিশ যার নেতৃত্বে ছিলেন নব-যোগদানকৃত পুলিশ সুপার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী বিপিএম (সেবা)।
জানা যায়, বগুড়া শহরের নাটাইপাড়া এলাকার একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে শিক্ষকতা করতেন মায়িশা ফারহা (২৪)। ছোট থেকে নিজের জন্ম পরিচয় না জানা মায়িশাকে দত্তক নেন বগুড়ার এক দম্পতি। পরে তারা তাকে নিজের মেয়ের মতো করে বড় করেন। একপর্যায়ে মায়িশার সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে নঁওগা জেলার মৃত: মতিউর রহমানের। সেখান থেকে পরিণয় হয় তাদের। মতিউর পেশায় ছিলেন একজন বীমা কর্মকর্তা ছিলেন। সব মিলিয়ে ভালো কাঁটছিল মতিউর মায়িশা দম্পতির সংসার। এর মাঝে দুটি কন্যা সন্তানও জন্ম হয় তাদের। যাদের বর্তমান বয়স পাঁচ ও আড়াই বছর। হটাৎ করোনার থাবায় চাকরি হারান মতিউর ও মায়িশা। এরপর মতিউর পেটের দায়ে শুরু করেন অটো রিকশা চালানো। তবে এই বছর জানুয়ারি মাসে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনিও। এদিকে দত্তক নেওয়া বৃদ্ধ বাবা-মা ও দুই সন্তানকে নিয়ে অসহায় হয়ে পরেন মায়িশা। সন্তানদের দুধের টাকা জোগাতে একপর্যায়ে শুরু করেন ভিক্ষাবৃত্তিও। এই সংক্রান্ত একটি ভিডিও বগুড়ার সিনিয়র এক সাংবাদিকের চোখে আসলে তিনি মায়িশার সাথে যোগাযোগ করে বগুড়ার স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান আকবরিয়া তে তাকে চাকরি নিয়ে দেন। মায়িশা গত এক সপ্তাহ হলো সেখানে পরিছন্নতাকর্মীদের (হাইজিন) সুপারভাইজার হিসেবে কর্মরত আছেন। এরই মাঝে জাতীয় একটি পত্রিকায় এই মায়িশার করুণ কাহিনী নিয়ে একটি সংবাদ প্রকাশ হলে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত ভাইরাল হয় যা নজরে আসার সাথে সাথেই সর্বপ্রথম মানবিক সহেযাগিতা নিয়ে এগিয়ে আসেন বগুড়া জেলা পুলিশ এবং নব-যোগদানকৃত পুলিশ সুপার। এ প্রসঙ্গে এসপি সুদীপ চক্রবর্তী বলেন, করোনায় বিশ^ব্যাপী এক অদৃশ্য জীবন যুদ্ধ চলছে যার মাঝে বাংলাদেশেও এই ক্রান্তিকালের মূহুর্তে বাংলাদেশ পুলিশ নিজেদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি চেষ্টা করছে মানবিকভাবে যতটুকু সম্ভব তা করার। পত্রিকার সংবাদের বরাতে তিনি যখন জানতে পেরেছেন করোনায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা এবং ২ কণ্যা সন্তানের জননী স্বামীহারা মায়িশা কষ্টে আছেন তখন তৎক্ষণাৎ তিনি নিজের অবস্থান থেকে জেলা পুলিশের পক্ষে যতটুকু সম্ভব করার প্রয়াস করেছেন। তিনি বলেন, ভবিষ্যতেও মায়িশাসহ তার পরিবারের পাশে জেলা পুলিশ থাকবে।
এদিকে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে সকল জায়গায় যোগাযোগের ফলে এবং প্রকাশিত সংবাদ দেখে সমাজের অনেকেই এগিয়ে এসেছেন এই মায়িশার পাশে। যার মাঝে বগুড়া রাজাবাজার আড়ৎদার ও সাধারণ ব্যবসায়ী সমিতির সদস্য সচিব ব্যবসায়ী নেতা পরিমল প্রসাদ রাজ ইতিমধ্যেই উপহারস্বরুপ ভাল পরিমাণের খাদ্যসামগ্রী ও মায়িশার সন্তানদের পুরো মাসের দুধের খরচের ব্যবস্থা করেছেন। শুধু তাই নয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের নামিদামী মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীগুলোও ভাল চাকুরির অফারও ইতিমধ্যে দিয়েছেন এই মায়িশা কে। ফ্রেশ গ্রুপের মতো অনেকে আবার নগদ অর্থ সহায়তাও পাঠিয়েছেন আজকে। মায়িশা ও তার পরিবারকে বগুড়া জেলা পুলিশের বিভিন্ন উপহার তুলে দেওয়ার সময় জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার যথাক্রমে আলী হায়দার চৌধুরী (প্রশাসন), আব্দুর রশিদ (অপরাধ), মোতাহার হোসেন (ডিএসবি), হেলেনা আক্তার (সদর) ও সদর থানার ওসি (তদন্ত) আবুল কালাম আজাদ উপস্থিত ছিলেন।
তবে বগুড়ায় সর্বপ্রথম চাকুরী প্রদানের মাধ্যমে তাকে আশার আলো জাগানো আকবরিয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান হাসান আলী আলালের সাথে কথা বললে তিনি জানান, মায়িশার বিষয়টি তার নজরে আসার সাথে সাথেই কর্মীর প্রয়োজন না থাকলেও তিনি তার নিয়োগের ব্যবস্থা করেন। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সুপারভাইজার হিসেবে ১ সপ্তাহ শিক্ষানবীশ দায়িত্ব পালন শেষে তাকে ইতিমধ্যেই ১৫ হাজার টাকা বেতনে প্রতিষ্ঠানে অফিসার সমমর্যাদার একটি পদে পদায়ন করা হয়েছে। মানবিক এই সহযোগিতার মাধ্যমে তিনিও আত্মতৃপ্ত হয়েছেন মর্মে জানান হাসান আলী আলাল।
সার্বিক বিষয়ে মায়িশার সাথে কথা বলা হলে তিনি বগুড়া জেলা পুলিশ এবং আকবরিয়া কে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। সেই সাথে যারা তার অসহায়ত্বের খবরে এগিয়ে এসেছেন তাদেরও ধন্যবাদ জানিয়ে নিজের দুই সন্তান কে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সকলের দোয়া ও সহযোগিতা কামনা করেছেন।